High Court

শুধু সংখ্যা নয়, প্রমাণ হতে হবে নথির গ্রহণযোগ্যতাও, নাগরিকত্ব মামলায় গুরুত্বপূর্ণ রায় দিল গুয়াহাটি হাই কোর্ট

আদালত জানায়, ১৯৬৪ সালের বিদেশি আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদেশি হওয়ার প্রশ্ন উঠলে, তিনি বিদেশি নন, তিনি ভারতের নাগরিক তা প্রমাণ করার দায়ভার সম্পূর্ণ ওই ব‍্যক্তির।

গুয়াহাটি হাই কোর্ট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, গুজরাট
  • শেষ আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬ ০৮:১৩

নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিল অসমের গুয়াহাটি হাই কোর্ট। একটি মামলার রায়ে আদালত জানিয়েছে, শুধু একাধিক নথি জমা দিলেই ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণিত হয় না। ভারতের নাগরিক বলে দাবি করে এক আবেদনকারী প্রমাণ‍্য নথি হিসেবে ১৬টি নথি দাখিল করেছিল। আদালতের পর্যবেক্ষণ, শুধু জমা দিলেই হবে না, নথির গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। ওই ব‍্যক্তি নিজের দাবি প্রতিষ্ঠা করতে না পারায় মামলা হাই কোর্ট খারিজ করে দিয়েছে।

আমিনুল হক নামে এক ব‍্যক্তি জনস্বার্থ মামলা করেছিলেন। জানা গিয়েছে, আমিনুলকে ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুয়াহাটির ফরেনার্স ট্রাইবুনাল বাংলাদেশি বলে ঘোষণা করেছিল। ট্রাইবুনালের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। আত্মপক্ষ সমর্থনে আমিনুল হক ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জিকার প্রতিলিপি জমা দেয়। হলফনামার সঙ্গে জমা দেওয়া সেই পত্রে আমিনুলের দাদু-দিদিমা ও বাবার নাম ছিল। এর পাশাপাশি ওই ব‍্যক্তি ১৯৬৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ভোটার তালিকা, ১৯৭৩ সালের জমির দলিল, প্যান কার্ড, ভোটার কার্ড এবং একটি স্কুল সার্টিফিকেট-সহ মোট ১৬টি সরকারি নথি হাই কোর্টের কাছে জমা দেয়। দাবি ছিল, তারা পরিবার বংশপরম্পরায় অসামেই বসবাস করেছে।

গত ৩০ জুন গুয়াহাটি হাই কোর্টের বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরানা ও বিচারপতি শামিমা জাহানের ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলাটির শুনানি হয়েছে। মামলার শুনানিতে আমিনুলের বাবা আদালতে উপস্থিত হয়ে ওই ব‍্যক্তিকে নিজের ছেলে হিসেবে শনাক্ত করে। কিন্তু আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, গ্রহণযোগ্য ও প্রাসঙ্গিক নথিগত প্রমাণ ছাড়া শুধুমাত্র মৌখিক সাক্ষ্য হিসেবে বাবা-ছেলের সম্পর্ক বা নাগরিকত্বের যোগসূত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়।

আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, আবেদনকারীর বাবার নাম বিভিন্ন নথিতে চার ভাবে লেখা হয়েছে— মহিরউদ্দিন শেখ, মাহরুদ্দিন শেখ, মহিরউদ্দিন এবং মহির উদ্দিন। যদিও আদালত এই বানানগত অসঙ্গতিকে একমাত্র ভিত্তি হিসেবে গুরুত্ব দেয়নি। আবেদনকারী দেখাতেই পারেননি যে তার দাদা পাসান আলি, বাবা মহিরউদ্দিন এবং ওই ব‍্যক্তি নিজে তিনটি পৃথক গ্রাম— দোবাকুরা, ঘুগুডোবা ও হাশদোবার ভোটার তালিকায় ধারাবাহিক ভাবে একই পরিবারের সদস্য হিসেবে কী ভাবে নথিভুক্ত ছিল।

ভোটার তালিকা নিয়ে ডিভিশন বেঞ্চ পর্যবেক্ষণে এ-ও জানিয়েছে, আবেদনকারী ভোটার তালিকার ফাঁকফোকর পূরণ করতে যুক্তি দিয়েছে যে পরিবারটি এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে স্থানান্তরিত হয়েছিল। ভোটার তালিকায় নাম নথিভুক্ত করার সময় ভুল হয়েছিল। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনও প্রমাণ‍্য নথি আমিনুল আদালতের কাছে উপস্থাপন করতে পারেনি।

এ ছাড়াও, ওই ব‍্যক্তি যে স্কুল সার্টিফিকেট আদালতের কাছে জমা দেন, তাতে উল্লেখ ছিল— আমিনুল ১৯৯৯ সালে স্কুল ত্যাগ করেছিলেন। তবে ওই সার্টিফিকেটের সত্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রধান শিক্ষক বা সার্টিফিকেট প্রদানকারী কোনও সাক্ষ্যে দেননি। ফলে আদালত ওই নথিকেও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করেনি।

গুয়াহাটি হাই কোর্ট শেষ পর্যন্ত ফরেনার্স ট্রাইবুনালের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করেনি। আমিনুল হকের জনস্বার্থ মামলা খারিজ করে দিয়েছে গুয়াহাটি হাই কোর্ট। আদালত জানিয়েছে, ১৯৬৪ সালের বিদেশি আইনের ধারা ৯ অনুযায়ী কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিদেশি হওয়ার প্রশ্ন উঠলে, তিনি বিদেশি নন এবং তিনি যে ভারতের নাগরিক তা প্রমাণ করার দায়ভার সম্পূর্ণ তাঁর নিজের। আদালত মনে করছে, নাগরিকত্ব প্রমাণের ক্ষেত্রে শুধু নথির সংখ্যা নয় বরং সেগুলির গ্রহণযোগ্যতা কতটা, নথির ধারাবাহিকতা কী আছে, এই নথিগুলির সঙ্গে পারস্পরিক যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আইনজীবী মহলের মতে এই রায় নাগরিকত্ব সংক্রান্ত মামলাগুলিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


Share