High Court

ম‍্যালহোলে পড়ে মৃত শ্রমিকদেরকে দিতে হবে ক্ষতিপূরণ, কলকাতা পুরসভাকে নির্দেশ কলকাতা হাই কোর্টের

ভিশন বেঞ্চ জানায়, ম্যানহোল বা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের কাজে কোনও মানুষকে নামানো যাবে না। মল-মূত্র বহনের কাজেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

কলকাতা হাই কোর্ট
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২২ নভেম্বর ২০২৫ ০৬:১২

ার বছর আগে, ২০২১ সালে কুদঘাটে নিকাশি নালা পরিষ্কার করতে ম্যানহোলে নামার পর বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে চারজন সাফাইকর্মীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে তিন জন ছিলেন একই পরিবারের। সেই ঘটনায় মৃতদের পরিবার পিছু ৩০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপুরণ দিতে কলকাতা পুরসভাকে নির্দেশ দিল কলকাতা হাই কোর্ট। 

এর আগে ওই ঘটনায় মৃতদের পরিবার পিছু ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিয়েছিল পুরসভা। শুক্রবার ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি চৈতালি চট্টোপাধ্যায় দাসের ডিভিশন বেঞ্চের নির্দেশ, তিন মাসের মধ্যে আরও ২০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে পুরসভাকে। ওই ঘটনায় জখম তিন জন সাফাইকর্মীকেও দু'মাসের মধ্যে পাঁচ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে বলেছে আদালত।

ডিভিশন বেঞ্চ জানায়, ম্যানহোল বা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কারের কাজে কোনও মানুষকে নামানো যাবে না। মল-মূত্র বহনের কাজেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এ ধরনের কাজে যুক্ত কর্মীদের পুনর্বাসন নিয়ে ২০১৩ সালের আইন আছে। সেই আইন এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মানতে হবে। নিকাশি পরিষ্কার–সংক্রান্ত কাজে যারা যুক্ত, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সেই জন্য একটি কমিটি গড়ে তুলবে রাজ্য সরকার। ২০২১ সালের কুঁদঘাটের ঘটনার তদন্ত করবেন কলকাতার নগরপাল। তিনি চার সপ্তাহের মধ্যে হাই কোর্টের রেজিস্ট্রারের কাছে একটি রিপোর্ট জমা দেবেন। এ ছাড়া, আদালতের নির্দেশ কতটা মানা হয়েছে, তার বিস্তারিত রিপোর্টও জমা দিতে হবে।

কুদঘাটের ওই দুর্ঘটনার পরও ম্যানহোলে মানুষ নামিয়ে কাজ করানো বন্ধ হয়নি। তার সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো কয়েক মাস আগের বানতলার ঘটনা। সেখানেও একই ভাবে নিকাশি নালা সাফ করতে নেমে মৃত্যু হয়েছিল তিন জনের।

২০২১ সালের কুঁদঘাটের ঘটনার প্রকৃত তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। নিহতদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবিও তোলা হয়েছে।সাফাইকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে। এইসব দাবিতে হাই কোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। তাদের আইনজীবী রঘুনাথ চক্রবর্তী এবং মেহবুব আহমেদের অভিযোগ ছিল, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা-ব্যবস্থা ছাড়াই ওই

সাফাইকর্মীদের ম্যানহোলে নামিয়েছিল পুরসভা। ওই ঘটনায় এর আগে মৃতদের ১০ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও আহতেরা ক্ষতিপূরণ পাননি। আইনজীবীরা দাবি করেন, এই ধরনের ঘটনায় মৃত বা জখম সাফাইকর্মীদের ২০১৩ সালের আইন অনুযায়ী উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে কর্তৃপক্ষকে।

পাল্টা দাবিতে পুরসভার আইনজীবী আলোককুমার ঘোষ জানান, যাবতীয় নিয়ম মেনে এবং বিমার ব্যবস্থা করে একটি সংস্থার সঙ্গে ওই কাজের চুক্তি করেছিল পুরসভা। ঘটনার উপযুক্ত তদন্ত করতে সাত সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। সেই সঙ্গে, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাকে পাঁচ বছরের জন্য কালো তালিকাভুক্ত করেছিল পুরসভা। যদিও মামলাকারীদের তরফে আলতাব আহমেদ এ দিন বলেন, "কুঁদঘাটের ঘটনায় পুরসভা নামেই তদন্ত কমিটি গড়েছিল। হাই কোর্টের এই রায়ে আমরা খুশি।"

এ দিন মামলার শুনানি হয়। শুনানিতে ডিভিশন বেঞ্চ একটি পর্যবেক্ষণ করে। বেঞ্চ জানায়, এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে সাধারণ মানুষদের দিয়ে বিপজ্জনক কাজ করানো হচ্ছে। এই কাজে কেউ মারা গেলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের আর্জি জানিয়ে মামলা হচ্ছে। সমাজের বহু ক্ষেত্রে সার্বিক উন্নতি হলেও কিছুস্তরের মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষায় এখনও লড়াই করতে হচ্ছে। ম্যানহোলে মানুষ নামিয়ে সাফাইকাজ করানো সমাজের জন্য লজ্জাজনক এবং দেশের জন্য অপমানজনক কাজ।

চার বছর আগের ওই ঘটনায় তিন তরতাজা ছেলে, মহম্মদ আলমগির (২৮), জাহাঙ্গির আলম (২৩) এবং সাবির আলমকে (১৭) হারিয়েছিলেন মালদহের হরিশ্চন্দ্রপুরের দম্পতি তোরাব আলি ও রোজিনা বিবি। এ দিন হাই কোর্টের নির্দেশ শুনে হতভাগ্য মা-বাবা শুধু বলেছেন, "টাকা দিলে তো তিন-তিনটি ছেলেকে ফিরে পাব না। সরকার, প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই আর্জি, ম্যানহোলে নামিয়ে কাজ করানোর সময়ে যাতে সব ধরনের সুরক্ষা-ব্যবস্থা থাকে, সেটা অন্তত দেখুন। আর কোনও মা-বাবার কোল যেন এ ভাবে খালি না হয়।"

দিনমজুরি করে সংসার চলে বৃদ্ধ তোরাবের। তিনি সাফ বলেন, "প্রশাসনের গাফিলতিতেই তিন ছেলেকে হারালাম। সামান্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া ছাড়া সরকার আর কী করেছে? যাঁদের গাফিলতিতে আমাদের সংসার ভেসে গেল, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারল না কেন?"

কলকাতা পুরসভার এক আধিকারিক অবশ্য দাবি করেছেন, কুঁদঘাটে ওই কাজ হচ্ছিল কেইআইআইপি-র অধীনে। যে সংস্থা কাজ করছিল, তাদের কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। হাই কোর্টের এ দিনের রায় প্রসঙ্গে মেয়র ফিরহাদ হাকিম বলেন, “আদালতের নির্দেশ এখনও হাতে পাইনি। পাওয়ার পরে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।”


Share