Argha Sen

রবীন্দ্রসঙ্গীত জগতের অপূরণীয় ক্ষতি, অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণে অবসান এক যুগের

অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলার সংস্কৃতি মহলে। প্রবীণ থেকে নবীন— সব প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীরাই তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তাঁদের মতে, অর্ঘ্য সেনের চলে যাওয়া মানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি শক্তিশালী স্তম্ভের পতন।

অর্ঘ্য সেন
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৩:০৯

চলে গেলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অর্ঘ্য সেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন তাঁর কাছে সাধারণ শিল্প নয়, তা গভীর ভাবের সাধনা। সেই অন্তর্লীন সাধনার পথে আজীবন হেঁটেছেন তিনি। ব্যতিক্রমী সেই শিল্পীর প্রয়াণে অবসান হল এক যুগের। বুধবার ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হয়েছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের অমর কণ্ঠ অর্ঘ্য সেন। বর্ষীয়ান সুরসাধকের প্রয়াণে শোকজ্ঞাপন করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

দীর্ঘ দিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা রোগে ভুগছিলেন। বুধবার সকালে তাঁর মৃত্যুসংবাদ এসেছে। তাঁর গাওয়া ‘আমার মাথা নত করে’ কিংবা ‘আমার হিয়ার মাঝে লুকিয়েছিলে’ গানগুলো এই প্রজন্মকেও ছুঁয়ে যায়। শিল্পীর প্রয়াণে শোক প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি লিখেছেন, “বিশিষ্ট রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণে আমি গভীর ভাবে শোকাহত। তাঁর চলে যাওয়া বাংলা সাংস্কৃতিক জগতের এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমি তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি। আমি তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবার ও অসংখ্য অনুরাগীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।”

১৯৩৫ সালের ১১ নভেম্বর বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই গানের সঙ্গে সখ্য। কিশোর বয়সেই তিনি কলকাতায় আসেন। বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলের ছাত্র ছিলেন। স্কুল শেষ করে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে বিজ্ঞান নিয়ে স্নাতক পাশ করেন। এরপর ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে কর্মজীবন শুরু করেন। তার পরে ন্যাশনাল সার্ভে অর্গানাইজেশন-এও কিছু দিন কাজ করেন।

ছোট থেকেই সঙ্গীতসাধনার শুরু। দেবব্রত বিশ্বাসের ছাত্র ছিলেন। রেডিয়োতে পঙ্কজকুমার মল্লিকের গান শুনে অনুপ্রাণিত হন। অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছেও শিক্ষা নেন। দেবব্রত বিশ্বাস -এর সান্নিধ্যে এসে তাঁর গানের ভুবন নতুন করে গড়ে ওঠে। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত যেন এক আলাদা মাত্রা পেত। তবে অনেকেই জানেন না তাঁর হাতের কাজও ছিল দারুণ। অত্যন্ত ভালো সেলাই করতেন তিনি। সঙ্গীত এবং শিল্প দুই পরিসরেই তাঁর অনায়াস যাতায়াত ছিল।

তার প্রয়াণে শেষ হল একটি যুগের। সুরের আলপনা মুছে দিয়ে চিরনিদ্রার দেশে পাড়ি দিলেন কিংবদন্তি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অর্ঘ্য সেন। দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। ৯০ বছর বয়সে না-ফেরার দেশে চলে গেলেন এই সুরের সাধক। তাঁর প্রয়াণে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সেই ‘শুদ্ধ’ এবং ‘ধ্রুপদী’ ঘরানায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হলো, যা অপূরণীয়।

অর্ঘ্য সেন ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে নিঃশব্দে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূল নির্যাসকে সযত্নে লালন করেছেন। সঙ্গীতভবনের প্রথাগত শিক্ষা আর গুরুদের নির্দেশে তাঁর গলায় রবীন্দ্রগান পেয়েছে এক অনন্য গাম্ভীর্য ও মাধুর্য। কণ্ঠের কারুকাজ নয়, বরং শব্দের আবেগ এবং তালের নির্ভুল প্রয়োগই ছিল তাঁর গানের প্রধান বৈশিষ্ট্য।

রবীন্দ্রসঙ্গীতের জগতে অর্ঘ্য সেন ছিলেন এমন এক শিল্পী, যিনি গানের কারুকাজের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিতেন গানের ভাব এবং শুদ্ধতাকে। তাঁর কণ্ঠের গভীরতা এবং মন্দ্রস্বর রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ‘আমার মিলন লাগি তুমি',‘গভীর রজনী নামিল হৃদয়ে’,‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’-এর মতো গান নতুন প্রাণ পেয়েছে তাঁর কণ্ঠে।

কেবল পরিবেশনাতেই নয়, শিক্ষক হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রবাদপ্রতিম। নতুন প্রজন্মের অসংখ্য ছাত্রছাত্রীকে তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের সঠিক ব্যাকরণ ও গায়কী শিখিয়েছেন। তাঁর হাত ধরেই তৈরি হয়েছে বহু স্বনামধন্য শিল্পী। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রচার ও প্রসারে তাঁর অবদান সঙ্গীত ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

অর্ঘ্য সেনের প্রয়াণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে বাংলার সংস্কৃতি মহলে। প্রবীণ থেকে নবীন— সব প্রজন্মের সঙ্গীতশিল্পীরাই তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। তাঁদের মতে, অর্ঘ্য সেনের চলে যাওয়া মানে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি শক্তিশালী স্তম্ভের পতন।

জীবনাবসান হলেও তাঁর গাওয়া অগণিত গান এবং তাঁর শেখানো আদর্শের মধ্য দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন অগণিত রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রেমীদের হৃদয়ে।


Share