Custodial Death

‘আমার ছেলেকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে,’ চন্দ্রকোনা থানায় বন্দির মৃত্যু, বিস্ফোরক দাবি মৃতের বাবার, আদালতে যাওয়ার হুঁশিয়ারি

মৃত যুবকের ভাইয়ের বক্তব্য, “আমার দাদাকে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের কেউ বলছে, প‍্যান্টের দড়ি গলায় জড়িয়েছে। কেউ বলছে দেওয়ালে মাথা ঠুকেছে। দুই পুলিশ দু’রকম বলছে।”

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, ঘাটাল
  • শেষ আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:৩৩

রাহুল রুইদাস আত্মহত‍্যা করেনি বরং তাঁকে হেফাজতে থাকাকালীন পিটিয়ে মারা হয়েছে। মৃত যুবকের বাবা বিফল রুইদাস এমনই বিস্ফোরক দাবি করেছেন। রাহুলের বাবার প্রশ্ন, হেফাজতে থাকাকালীন কীভাবে আত্মঘাতী হয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সন্তানহারা বাবা। বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হবেন বলেও মৃতের বাবা জানিয়েছেন।

রবিবার রাতে পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন রাহুল রুইদাস (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। রাহুল চন্দ্রকোনা থানার বাগেশ্বরপুরের বাসিন্দা। পরিবারের বক্তব্য, এলাকায় রাহুল চুরি করত স্থানীয়েরা তা মোটামুটি জানে। সেই অভিযোগে রাহুলকে গত চার দিন আগে চন্দ্রকোনা থানার পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। কিন্তু রাহুলকে যে থানায় আটক করে নিয়ে গিয়েছে সেই খবর পুলিশ পরিবারের কাউকেই জানায়নি। আদালতেও হাজির করানো হয়নি। এমনকী, এক সিভিক ভলান্টিয়ারকে দিয়ে পরিবারের সদস্যদের ফোন করা হত। সেই সিভিক ভলান্টিয়ারকে দিয়ে রাহুলের জন‍্য জামাকাপড় থানায় পাঠিয়ে দিতে বলত পুলিশ।

কিন্তু পুলিশের দাবি, গত চারদিন আগে রাহুলকে চুরির অভিযোগে রাহুলকে তাঁরা গ্রেফতার করেছিল। তাঁকে ঘাটাল মহকুমা আদালতে হাজির করানো হলে চার দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই থেকে পুলিশের হেফাজতেই ছিল রাহুল। পুলিশি হেফাজতে থাকাকালীন রবিবার তিনি শৌচাগারে যান। সেখানেই পরনের প‍্যান্ট গলায় জড়িয়ে রাহুল আত্মহত্যার চেষ্টা করে বলে পুলিশ দাবি করেছে। সে ক্ষেত্রেও, পুলিশের নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। থানার ভিতরে সিসি ক্যামেরা থাকে। রাহুল যে এই কান্ড করছে তা কীভাবে ধরা পড়ল না। যদি নজরে এসে থাকে তা হলে কেন দ্রুত পদক্ষেপ করা হল না।

রাহুলের বাবা রাহুল রুইদাসদের অভিযোগ, ওঁকে গ্রেফতার করার পরে পুলিশ অত‍্যাচার করেছে। আদালত থেকে হেফাজতে নিয়ে এসে চার দিন ধরে ওঁকে পিটিয়েছে। পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন কী করে আত্মহত‍্যা করতে পারে তা অসহায় বিফল রুইদাস বিশ্বাস করতে পারছেন না। তিনি ঘাটাল আদালতে ন‍্যায়বিচার চেয়ে মামলা করে দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

সন্তানকে হারানোর পরে কার্যত কান্নায় ভেঙে পড়েন যুবকের মা। মৃতের মা বলেন, “আমার ছেলেটাকে পুলিশ মেরে দিয়েছে। চারদিন ধরে কেউ রাখে থানায়! পুলিশ একদিন রেখে তাঁকে জেলে পাঠিয়ে দিতে পারত। চারদিন কী করতে রাখবে? পুলিশ নেশা করে করে আমার ছেলেটাকে মেরেছে। পিটিয়ে মেরে দিয়েছে পুলিশ।”

মৃত যুবকের ভাইয়ের বক্তব্য, “আমার দাদাকে মেরে ফেলা হয়েছে। পুলিশের কেউ বলছে, প‍্যান্টের দড়ি গলায় জড়িয়েছে। কেউ বলছে দেওয়ালে মাথা ঠুকেছে। দুই পুলিশ দু’রকম বলছে।”

পশ্চিম মেদিনীপুরের জেলা পুলিশের সুপার পাপিয়া সুলতানা দাবি করেন, “আমাদের কাছে সিসি ক‍্যামেরার ফুটেজ রয়েছে। ওই দিন ৮টা ১০ নাগাদ শৌচাগারে যায়। শৌচাগারের বাইরে পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। রাহুল আগেও গ্রেফতার হয়েছিল। কিন্তু আধ ঘণ্টা পরেও শৌচাগার থেকে না বের হলে ভিতরে পুলিশের কর্মীরা যায়। গিয়ে তাঁরা দেখতে, সাওয়ারের প‍্যান্টের দড়ি দিয়ে ফাঁস লাগানোর চেষ্টা করছে। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাঁকে নিকটবর্তী হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ঘাটাল মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে রাহুলকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।”

সোমবার রাহুলের দেহ ঘটাল হাসপাতালে রাখা হয়েছে। এ দিন পরিবারের তরফে কেউ হাসপাতালে না আসায় ময়নাতদন্ত করা সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার দেহের ময়নাতদন্ত করা হবে বলে জানা গিয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলেই কী ভাবে মৃত্যু হয়েছে তা স্পষ্ট হবে বলে বিফলের আইনজীবী জানিয়েছেন। তবে বিভাগীয় তদন্ত হতে পারে বলে জেলা পুলিশের আধিকারিক জানিয়েছেন।

উল্লেখ্য, গত ৮ সেপ্টেম্বর দক্ষিণ ২৪ পরগনার বাখরাহাট ফাঁড়িতে এক বন্দির মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বিজেপি নেতার নির্দেশে তাঁকে থানায় তুলে নিয়ে এসে পিটিয়ে মেরে ফেলার অভিযোগ করেছিল পরিবার। সেই মামলাটির এখনও তদন্ত চলছে। তার উত্তর ২৪ পরগনার বীজপুরে বিরজু কেওট নামে এক তৃণমূলকর্মীকে থানায় ভিতরেই পিটিয়ে হ‍ত‍্যা করার অভিযোগ ওঠে। সেই ঘটনায় থানার কয়েক জন আধিকারিককে সাসপেন্ডও করা হয়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে আবার পুলিশের হেফাজতে থাকাকালীন বন্দির মৃত্যুর ঘটনা ঘটল।


Share