Land Scam

উদ্বাস্তুদের জমির দিকেই নজর ছিল সুমিতের, দুর্নীতির টাকা পৌঁছে দিতেন বিধায়ক সুজয়, তদন্তে হাতিয়ার অভিষেকের দুই দেহরক্ষীর বয়ান

সিআইডির চার্জশিটে উল্লেখ, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুমিতের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে মোট সাত কোটি টাকা জমা পড়েছে। এই টাকার উৎস কী, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তা জানাতে পারেননি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:২১

উদ্বাস্তুদের জমির দিকেই নজর ছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়ের। উদ্বাস্তুদের জমি দখল করে তা বিক্রি করা হত। বেআইনি ভাবে জমি বিক্রির টাকা সুমিত রায়ের কাছে পাঠিয়ে দিতেন প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরা। আগেই সুজয়কে পুলিশ গ্রেফতার করেছ। এই জমি দুর্নীতির শিকড় অনেক গভীরে ছিল। চার্জশিটে এমনটাই দাবি করেছে রাজ‍্য পুলিশের সিআইডি। সূত্রের খবর, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন দুই দেহরক্ষীর বয়ানে এই তথ্য উঠে এসেছে বলে পুলিশ চার্জশিটে উল্লেখ করেছে।

সিআইডি গত ২ সেপ্টেম্বর শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় চার্জশিট দিয়েছিল। জানা গিয়েছে, তাতে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরার নাম থাকলেও অভিযুক্ত হিসেবে সুমিত রায়ের নাম নেই। মোট ২০ জন সাক্ষীর কথা চার্জশিটে সিআইডি উল্লেখ করেছে। তাঁদের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দু’জন প্রাক্তন দেহরক্ষী এবং দু’জন গাড়িচালক রয়েছে। এ ছাড়াও, বেশ কয়েক জন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ীরাও সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন।

চার্জশিটে সিআইডির দাবি করেছে, সাক্ষীদের বয়ান থেকে এবং স্থানীয় ভাবে খোঁজ নিয়ে পুলিশ জানতে পেরেছে, যে জমিতে জালিয়াতি হয়েছে তা সরকারি জমি ছিল। জমিটি উদ্বাস্তুদের চাষাবাদের জন্য সরকার বরাদ্দ করেছিল। সুজয় হাজরা, অনিতেশ পাইরা এবং তাঁদের সহযোগীরা ওই সরকারিটি জমি দখল করে নেয়। মূলত সুজয় এবং সুমিতের নির্দেশেই জমি মাফিয়ারা জমিটি দখল করেছিল।

সুমিত রায়ের সঙ্গে স্থানীয় কয়েক জনের আর্থিক লেনদেনের হদিস পেয়েছে সিআইডি। সাক্ষীদের বয়ান থেকে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে, প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সুজয় হাজরা জমি জালিয়াতির টাকার একটা বড় অংশ সুমিত রায়ের দফতরে পাঠিয়ে দিতেন। সিআইডি জানিয়েছে, উদ্বাস্তুদের জমি জালিয়াতি করে বিক্রির যে সংঘটিত চক্র তৈরি হয়েছিল তার মূল মাথায় ছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়। অভিষেকের প্রাক্তন দুই দেহরক্ষী বয়ানে সে কথা জানিয়েছেন। দুই দেহরক্ষী এক জন আলিপুরদুয়ার এবং এক জন নদিয়ার বাসিন্দা বলে জানা গিয়েছে।

এ ছাড়াও, সুজয়ের হয়ে কাজ করতেন দুই দালাল— দেবাশিস দে এবং সুব্রত হাজরা। তাঁরাও সুমিতকে টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন। সৈয়দপুর গ্রামের দুই বাসিন্দাও সুজয়-সুমিতের আর্থিক লেনদেনের কথা সিআইডিকে জানিয়েছেন। এর আগে ভয়ে তাঁরা কাউকে কিছু বলতে পারেননি বলেও সিআইডি চার্জশিটে উল্লেখ করেছে।

বেশ কিছু জমির দলিল বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তাতে যাঁরা বিক্রেতা হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে, তা ‘ভুয়ো’, মনে করছে সিআইডি। কারণ, তাঁদের অনেককেরই নির্দিষ্ট ঠিকানায় পাওয়াই যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারাও তাঁদের অনেককেই চিনতে পারেননি। ফলে তাঁদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সিআইডি মনে করছে, বিক্রেতা হিসেবে কাল্পনিক কিছু নাম-ঠিকানা দলিলে ব্যবহার করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন ধরে ওই জমিতে স্থানীয়েরা চাষাবাদ করছিলেন। ২০২১ সালের পর তাঁদের জোর করে সেখান থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

সিআইডির চার্জশিটে উল্লেখ, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুমিতের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্টে মোট সাত কোটি টাকা জমা পড়েছে। এই টাকার উৎস কী, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তা জানাতে পারেননি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপ্তসহায়ক সুমিত রায়।

অভিষেকের আপ্তসহায়ককে সুপ্রিম কোর্ট রক্ষাকবচ দিয়েছিল। কিন্তু তিনি তদন্তে সহযোগিতা করছেন না বলে জানায় রাজ্য। দুর্নীতির পাহাড় গড়েছিলেন বলে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন। আদালত দু’পক্ষের বক্তব্য শুনে সুমিতের রক্ষাকবচ বাতিল করে দেয়। অভিযোগ, আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর বার বার এড়িয়ে যাচ্ছিলেন সুমিত। রক্ষাকবচ বাতিল হওয়ার পরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়েপসকালীঘাটের বাড়ি থেকে সুমিতকে গ্রেফতার করে। আপাতত তিনি গোয়েন্দাদের হেফাজতে রয়েছেন।


Share