Dengue

ডেঙ্গি রুখতে বড় পরীক্ষা নতুন সরকারের, পুরবোর্ড-পঞ্চায়েতে অচলাবস্থার মাঝে বাড়ছে এডিসের দাপট

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গিতে রাজ্যে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গি পজিটিভ থাকা অবস্থায় মৃতদেরও হিসাবের মধ্যে ধরলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ৩০ আগস্ট ২০২৬ ০২:৪৩

বিপদ চেনা। কী ভাবে সেই বিপদ মোকাবিলা করতে হয়, তার কৌশলও জানা। তবু পরিবর্তনের বছরে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে প্রত্যাশিত সাফল্য আসবে কি না, তা নিয়ে রাজ্যের জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্ষা শেষ হলেই নতুন সরকারের আমলে স্বাস্থ্য ভবন ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হবে। সেই প্রস্তুতির অংশ হিসাবেই গত মঙ্গলবার ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় পর্যালোচনা বৈঠক করেন। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, এখনও পর্যন্ত ডেঙ্গিতে রাজ্যে সাত জনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গি পজিটিভ থাকা অবস্থায় মৃতদেরও হিসাবের মধ্যে ধরলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০।

স্বাস্থ্য ভবনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯ অগস্ট পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হয়েছেন চার হাজার ৩৫ জন। আক্রান্তের হার ০.৭ শতাংশ। গত বছর একই সময়ে, অর্থাৎ বছরের প্রথম ৩৩ সপ্তাহে, আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ছ'হাজার ৪৮৮। আক্রান্তের হার ছিল এক শতাংশ। অর্থাৎ, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছরে ডেঙ্গি আক্রান্তের হার আপাত ভাবে কম। তবে এই পরিসংখ্যান নিয়ে পুরোপুরি স্বস্তিতে থাকার জায়গা নেই। কারণ, গত বছরের তুলনায় এ বছর ডেঙ্গি পরীক্ষার সংখ্যাই কম হয়েছে। ফলে আক্রান্তের হার কম থাকার প্রকৃত ছবি কতটা প্রতিফলিত করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ডেঙ্গিতে রাজ্যে মোট ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল।

এ বার শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামাঞ্চলেও ঘাঁটি গেড়েছে ডেঙ্গির বাহক এডিস মশা। জলপাইগুড়ির মাল থেকে কলকাতা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে এডিসের দাপট। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মশা নিয়ন্ত্রণে সামান্য ঢিলেমি হলেই পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরে রাজ্যের একাধিক এলাকায় আচমকাই ডেঙ্গির প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে জলপাইগুড়ির মাল ও মাটিয়ালি, মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি এবং রঘুনাথগঞ্জ-২ ব্লক, পূর্ব বর্ধমানের ভাতার ও পূর্বস্থলি-১ ব্লক, দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়-১ ও ভাঙড়-২ এবং নদিয়ার তেহট্ট-১ ব্লক ও চাকদহ।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত কলকাতা ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যায় শীর্ষে রয়েছে। শহরে আক্রান্তের সংখ্যা ২৬৪। এর পর রয়েছে ভাঙড়-২ ব্লক (৮৬), হাওড়া (৭৮), পূর্বস্থলি-১ (৬৭) এবং আসানসোল (৬৫)। এই পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মত, ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে পুরসভা ও পঞ্চায়েতগুলিকে আরও সক্রিয় ভাবে মাঠে নামতে হবে। না হলে এডিস মশার বিস্তার রোখা কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁদের আশঙ্কার অন্যতম কারণ হল, রাজ্যের সাতটি পুরনিগম এবং ১১৯টি পুরসভার অধিকাংশ জায়গাতেই বর্তমানে নির্বাচিত বোর্ড নেই। ফলে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের সক্রিয় উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে না।

একই ছবি গ্রামাঞ্চলেও। রাজ্যের তিন হাজার ৩৯০টি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রশাসনিক ব্যবস্থাতেও কার্যত একই রকম অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। পঞ্চায়েত প্রধানদেরও অনেক জায়গায় সক্রিয় ভাবে দেখা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতির মধ্যেই একশো দিনের কাজের প্রকল্পে গতি ফেরাতে বিধানসভায় সংশোধনী বিল আনতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন পঞ্চায়েত মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ।

ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে রাজ্য স্বাস্থ্য দফতরের জনস্বাস্থ্য আধিকারিকদের বক্তব্য, প্রতি বছর লার্ভা নিধনের কাজে জেলায় জেলায় জনপ্রতিনিধিরাই কার্যত নোডাল অফিসারের ভূমিকা পালন করতেন। ডেঙ্গি মোকাবিলায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলির একটি হল ভেক্টর বর্ন ডিজিজ কন্ট্রোলের স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নজরদারি চালানো। কোথায় কোথায় ডেঙ্গির লার্ভা রয়েছে, তাঁরাই সেই তথ্য সংগ্রহ করেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী পদক্ষেপ ও রণকৌশল ঠিক করা হয়।

এত দিন কোনও ওয়ার্ড বা পঞ্চায়েত এলাকায় ডেঙ্গি মোকাবিলার কাজে সমস্যা দেখা দিলে স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকেরা সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলর বা পঞ্চায়েত প্রধানের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন। কিন্তু এ বার সেই ব্যবস্থায় বদল আসায় প্রশ্ন উঠছে, পরিস্থিতি সামলানো হবে কী ভাবে?

এ দিকে, স্বাস্থ্য ভবন সূত্রে জানা গিয়েছে, ডেঙ্গি ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপের মধ্যে এ বছরও ডেন-২-এর প্রভাবই বেশি। একেবারে প্রাথমিক পর্যায়েই সতর্ক না হলে ডেন-২ সংক্রমণ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে যাঁরা দ্বিতীয় বার ডেঙ্গিতে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ডেন-২ গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শনিবার একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে শারদ্বত বলেন, ‘‘সামনের তিন মাস ডেঙ্গির মোকাবিলা করা সত্যিই চ্যালেঞ্জ। স্বাস্থ্য ভবন তৎপর রয়েছে। দেখি আমরা কতটা কী করতে পারি।’’ স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের মতে, এল নিনোর প্রভাবে এ বছর শীত আসতে দেরি হতে পারে। তাই নভেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গির প্রকোপ থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই বলে বক্তব্য স্বাস্থ্য ভবনের আধিকারিকদের।

প্রথম বিজেপি সরকারের কাছে ডেঙ্গি মোকাবিলা যে চ্যালেঞ্জ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ও তা মানছেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী তো বলছেন, পুরনিগম, পুরসভা, পঞ্চায়েত স্তরে কী সেই চ্যালেঞ্জ আত্মস্থ করতে পারছেন প্রশাসনিক আধিকারিকেরা? তৃণমূল স্তরের জনপ্রতিনিধিদের অনুপস্থিতিতে এ বছর ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে তাঁদের ভূমিকাই তো আসল। কলকাতা পুরসভা-সহ জেলাস্তরের পুরসভাগুলির স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত চিকিৎসক, আশা কর্মী, ভেক্টর বর্ন ডিজ়িজ় কন্ট্রোলে যুক্ত স্বাস্থ্যকর্মীদের বক্তব্যে সেই আত্মবিশ্বাস কোথায়? কলকাতা পুরসভা সূত্রের খবর, খাস কলকাতায় অবস্থিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকেরা ‘আয়ুষ্মান ভারতে’র তথ্য আপলোডের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। আর উপভোক্তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশা কর্মীরা সেই তথ্য যাচাইয়ের কাজ করছেন। জেলার পুরসভাগুলিতে সেখানকার স্বাস্থ্যকর্মীরা দিনভর একই কাজ করছেন। ফলে বাড়ি বাড়ি জ্বরের খোঁজ রাখার পাশাপাশি ডাবের খোলা, টায়ার,পরিত্যক্ত পাত্রে থাকা জমা জলে মশার বংশবৃদ্ধির পরিস্থিতির উপরে যাঁরা নজর রাখতেন তাঁদের দেখা মিলছে না! কলকাতা পুরসভার পরিস্থিতি নিয়ে বিজেপি বিধায়ক সজল ঘোষ বলেন, ‘‘ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণের কাজ কোনও না কোনও প্রশাসনিক আধিকারিকেরা পরিচালনা করতেন। তাঁদের মাথায় থাকতেন মেয়র পারিষদেরা। এখন তাঁরা না থাকায় অসুবিধা হচ্ছে ঠিকই। তবে এই অসুবিধার জন্য দায়ী কে? দায়ী কলকাতা, সল্টলেকের প্রাক্তন মেয়রেরা। তাঁরাই তো বোর্ড ভেঙে দিয়ে পালিয়ে গেলেন। বিজেপি কোথাও বলপ্রয়োগ করে বোর্ড ভাঙেনি। এরাই বোর্ড ভেঙে পালিয়ে গিয়েছেন। এখন সাধারণ মানুষকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে আমরা বিধায়কেরা মাঠে ময়দানে আছি।’’

স্বাস্থ্য ভবনের রিপোর্ট অনুযায়ী, এ বছর জলপাইগুড়ি, পূর্ব বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ এবং নদিয়ার যে সব এলাকায় ডেঙ্গির প্রকোপ দেখা দিয়েছে, সেখানে সংক্রমণ ছড়ানোর অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোলা এবং জমে থাকা আবর্জনা। ভাতার ও পূর্বস্থলীর মতো এলাকায় আবার হাসপাতাল চত্বর থেকেই ডেঙ্গি সংক্রমণ ছড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে নজরদারি ও প্রতিরোধে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা যদি নিয়মিত মাঠে না নামেন, তবে ডেঙ্গির প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে তা মেনেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘পুরবোর্ডগুলি না থাকলেও কাউন্সিলরদের কাজ বিধায়কেরা তো এখন করছেন। নইলে সিভিক সোসাইটি তো ভেঙে পড়ত, তা তো হয়নি। আমি নিজে বিধাননগর পুরনিগম, নবদিগন্ত, দক্ষিণ দমদম পুরসভার কাজ দেখছি। বিজেপির ২০৭ জন বিধায়ক রয়েছে। কোথাও কোনও অসুবিধা হবে না।’’


Share