Sunita Williams

‘স্কাই ইজ় নট দ্য লিমিট’, ৬০৮ দিনের মহাকাশযাত্রার পর নাসাকে বিদায় সুনীতা উইলিয়ামসের

৬০৮ দিন মহাশূন্যে কাটিয়ে, তিন অভিযানে একাধিক রেকর্ড- ২৭ বছরের বর্ণময় অধ্যায় শেষে 'নাসা' থেকে অবসর নিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত মহাকাশ কন্যা সুনীতা উইলিয়ামস। আকাশ ছোঁয়ার গল্পে অনুপ্রেরণা।

সুনীতা উইলিয়ামস
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২১ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৫৯

‘স্কাই ইজ় নট দ্য লিমিট’— সুনীতা উইলিয়ামসের জীবনে এই কথাই যেন সবচেয়ে মানানসই। মহাবিশ্বে, মহাকাশে, মহাকালের মাঝে যাঁর অবাধ বিচরণ সেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন নভোচর সুনীতা উইলিয়ামস অবশেষে অবসর নিলেন 'নাসা' থেকে। মহাশূন্যে মোট ৬০৮ দিন কাটিয়ে একের পর এক নজির গড়া এই ‘মহাকাশ কন্যা’ ২৭ বছরের বর্ণময় কেরিয়ারের ইতি টানলেন। গত ২৭ ডিসেম্বর খাতায়-কলমে অবসর কার্যকর হলেও, মঙ্গলবার পাকাপাকি ভাবে 'নাসা'-কে বিদায় জানালেন তিনি।

শুধু সাফল্যের নিরিখেই নয়, 'নাসা'-র ইতিহাসে অন্যতম সফল নভোচরদের তালিকায় উজ্জ্বল নাম সুনীতা উইলিয়ামস। দীর্ঘ কেরিয়ারে তিনবার মহাকাশে পাড়ি দিয়ে মানব সভ্যতার সামনে খুলে দিয়েছেন গবেষণার নতুন নতুন দিগন্ত। অথচ ছোটবেলায় কখনওই অ্যাস্ট্রোনট হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি তিনি। বরং জীবনের প্রায় প্রতিটি ধাপে ‘দ্বিতীয় পছন্দ’ই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে সাফল্যের শিখরে।

এক সাক্ষাৎকারে সুনীতা জানিয়েছিলেন, তিনি আদতে পশু চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভর্তি হন মেরিল্যান্ডের ইউএস নেভাল অ্যাকাডেমিতে। সেখানেও তাঁর প্রথম আগ্রহ ছিল ডাইভিং। পরে হন পাইলট, যদিও জেট বিমানের বদলে হেলিকপ্টার ওড়ানোর দায়িত্বই প্রথমে তাঁর কাঁধে আসে। কিন্তু আকাশই যাঁর নিয়তি, তাঁর ডানায় বাঁধা কি দেওয়া যায়? জনসন স্পেস সেন্টার পরিদর্শনই বদলে দেয় সুনীতার জীবনের গতিপথ।

সেই পরিদর্শনের সময় কিংবদন্তি মহাকাশচারী জন ইয়ং-এর সংস্পর্শে এসে মহাকাশবিজ্ঞানের প্রতি আকৃষ্ট হন তিনি। তখন থেকেই গ্রহ, উপগ্রহ, নক্ষত্র আর গ্যালাক্সির স্বপ্ন বুনতে শুরু করেন সুনীতা। প্রথমবার 'নাসা'-র মহাকাশচারী প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করেও সফল হননি। যোগ্যতার ঘাটতিতে সুযোগ হাতছাড়া হলেও হার মানেননি তিনি। পাইলট স্কুলে ফিরে প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করে অবশেষে ১৯৯৮ সালের জুনে 'নাসা'-র ১৮তম মহাকাশচারী দলের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন সুনীতা উইলিয়ামস। তারপর থেকেই তাঁর কেরিয়ার লেখা হয়েছে ‘তারায় তারায়’।

'নাসা'-র ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সময় মহাকাশে কাটানোর রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। সহকর্মী বুচ উইলমোরের সঙ্গে একটানা ২৮৬ দিন মহাকাশে থাকার কীর্তিও গড়েছেন তিনি। মহিলা মহাকাশচারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি— মোট ৯টি স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেছেন সুনীতা, যার মোট সময় ৬২ ঘণ্টা ৬ মিনিট। এটি 'নাসা'-র সর্বকালের তালিকায় চতুর্থ এবং মহিলা নভোচরদের মধ্যে সর্বোচ্চ।

২০০৬ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রথমবার মহাকাশে পা রাখেন সুনীতা উইলিয়ামস। STS-116 মিশনে স্পেস শাটল ডিসকভারিতে চড়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে যান তিনি। সেই মিশনে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পাশাপাশি চারটি স্পেসওয়াকে মোট ২৯ ঘণ্টা ১৭ মিনিট কাটিয়ে তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। দীর্ঘ সময়ের স্পেসওয়াক যে সম্ভব, তা কার্যত প্রমাণ করে দিয়েছিলেন তিনিই।

১৯৬৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ওহাইওতে জন্ম সুনীতা উইলিয়ামসের। তাঁর বাবা দীপক পান্ডিয়ার জন্ম গুজরাটের মেহসানার ঝুলাসন গ্রামে। কর্মসূত্রে তিনি আমেরিকায় চলে গেলেও, ভারতের সঙ্গে আত্মিক যোগ কখনও ছিন্ন হয়নি— না বাবার, না মেয়ের।

নিয়ম অনুযায়ী ৬০ বছরে পা দিয়েই অবসরে গেলেন এই মহাকাশ কন্যা। তবে বিদায়ী বক্তব্যেই স্পষ্ট, মহাকাশের প্রতি তাঁর টান আজও অটুট। সুনীতা বলেন, ‘যারা আমাকে চেনেন তাঁরা জানেন, মহাকাশ আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। NASA-তে কাজ করা এবং তিনবার মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার সুযোগ পাওয়াটা দারুণ সম্মানের। নাসায় আমার ২৭ বছরের অসাধারণ কেরিয়ারের মূল কারণ আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে পাওয়া অসাধারণ ভালোবাসা এবং সমর্থন।’ সহকর্মীদের ভালোবাসা ও সমর্থনকেই নিজের দীর্ঘ কেরিয়ারের মূল শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন, আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নত বৈজ্ঞানিক গবেষণা ভবিষ্যতে চাঁদ ও মঙ্গল অভিযানের পথ আরও মসৃণ করবে বলেও আশাবাদী সুনীতা। 'নাসা'-র পরবর্তী প্রকল্পগুলি নতুন ইতিহাস গড়বে— সেই আশাতেই তিনি তাকিয়ে আছেন ভবিষ্যতের দিকে।

'নাসা' ছাড়লেও প্রশ্ন থেকেই যায়,  ভালোবাসার টানে কি আবার মহাকাশে ফিরবেন সুনীতা উইলিয়ামস? বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার দরজা তো খোলা। কে জানে, রেকর্ডের খাতায় হয়তো একদিন যুক্ত হবে সবচেয়ে বেশি বয়সে মহাকাশে পাড়ি দেওয়ার নতুন এক কীর্তিও।


Share