Madan Mitra

স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে সার্কিট হাউসে ‘হেনস্থা’ মহুয়াকে! ঘর ছাড়ার নির্দেশ, বাইরে বিজেপির বিক্ষোভ-স্লোগান, স্পিকারকে চিঠি সাংসদের

সেখানে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও দেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে পরিস্থিতি সত্ত্বেও মহুয়া ঘর ছাড়েননি। ঘটনার পর রাতেই কৃষ্ণনগরের সাংসদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দেন। পাশাপাশি, বিষয়টি নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

মহুয়া মৈত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কৃষ্ণনগর
  • শেষ আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ ০২:০৮

স্বাধীনতা দিবসের আগের রাতে নদিয়ার সার্কিট হাউসে কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে হেনস্থার অভিযোগ উঠল। মহুয়ার দাবি, রাত পৌনে ১০টা নাগাদ অতিরিক্ত জেলাশাসক (এডিএম) ফোন করে তাঁকে সার্কিট হাউসের ঘর খালি করে দিতে বলেন। সাংসদের অভিযোগ, সেই সময় তাঁর ঘরের বাইরে বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা জড়ো হয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন। সেখানে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগানও দেওয়া হচ্ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি। তবে পরিস্থিতি সত্ত্বেও মহুয়া ঘর ছাড়েননি। ঘটনার পর রাতেই কৃষ্ণনগরের সাংসদ লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি দেন। পাশাপাশি, বিষয়টি নিয়ে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন।

মহুয়া জানিয়েছেন, শুক্রবার সন্ধ্যা ছ'টা ১৫ মিনিট নাগাদ তিনি কৃষ্ণনগরের সার্কিট হাউসে পৌঁছোন। সাংসদ হিসেবে এর আগেও তিনি সেখানে থেকেছেন। তাঁর জন্য আগের মতো একই ঘরটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। সময়মতো তাঁকে চা ও রাতের খাবারও পরিবেশন করা হয়। মহুয়ার দাবি, রাত ন'টা ৪৭ মিনিট নাগাদ নদিয়ার এডিএম তাঁকে ফোন করে ঘরটি ছেড়ে দিতে বলেন। এর কিছুক্ষণ পর, রাত ১০টা ৫২ মিনিটে তাঁকে ঘর ছাড়ার নির্দেশ সংক্রান্ত একটি লিখিত বার্তাও পাঠানো হয়। তবে সেই নির্দেশ মানতে মহুয়া রাজি হননি। অভিযোগ, এর মধ্যেই সার্কিট হাউসের বাইরে বিজেপির একদল কর্মী-সমর্থক জড়ো হয়ে মহুয়ার বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে শুরু করেন। মহুয়ার অভিযোগ, ঘটনাটি প্রশাসনের নজরে থাকলেও বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি।

স্পিকারকে লেখা চিঠিতে মহুয়া বলেছেন , ‘‘সন্ধ্যা ছ'টা ১৫ মিনিটে আমি সার্কিট হাউসে ঢুকেছিলাম। সাতটা নাগাদ চা দেওয়া হয়। ন'টা ২০ মিনিটে রাতের খাবার। ন'টা ৪৭ মিনিটে নদিয়ার এডিএম আমাকে ফোন করে ঘর ছেড়ে দিতে বলেন। কারণ জিজ্ঞেস করায় জানান, ‘উপরমহল থেকে নির্দেশ’ এসেছে। রাত ১০টা ৫২ মিনিটে জেলা প্রশাসন আমার হোয়াট্‌সঅ্যাপে সেই নির্দেশের কপি পাঠায়। বলা হয়, বার্ষিক সাফাই অভিযানের জন্য সার্কিট হাউসে নতুন করে কোনও ঘর বুক করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমার বুকিংটি নতুন ছিল। তাই তা বাতিল করা হয়েছে। অথচ, আমি যখন বুকিং করেছি, যখন সার্কিট হাউসে গিয়েছি, কেউ আমাকে এ বিষয়ে কিছু জানাননি। যদি সত্যিই নির্দেশ থাকত, আমাকে সেটা জানানোর জন্য রাত ১০টা পর্যন্ত কেন অপেক্ষা করল প্রশাসন? ১০টা ৫২ মিনিটে কেন নির্দেশের কপি পাঠানো হল?’’

তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘‘রাত ১১টা নাগাদ হঠাৎ আমি চিৎকার শুনতে পাই এবং বুঝতে পারি, বাইরে বিশাল জমায়েত হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। এক দিকে প্রশাসন আমাকে ঘর ছাড়তে বলছে, অন্য দিকে বাইরে জমায়েত আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এই সার্কিট হাউসের একেবারে উল্টো দিকেই জেলার পুলিশ সুপার আর জেলাশাসকের বাংলো। সেখানে কোনও জমায়েত হওয়ারই কথা নয়।’’

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অগ্রাধিকারের তালিকায় সাংসদদের অবস্থান ২১ নম্বরে। লোকসভার স্পিকারকে লেখা চিঠিতে সেই বিষয়টি কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র মনে করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, কোনও রাজ্যের মুখ্যসচিব বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনিক প্রধানদের তুলনায়ও সাংসদদের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পায়। মহুয়ার বক্তব্য, কোনও সাংসদ নিজের এলাকায় গেলে সাধারণত সার্কিট হাউসে থাকেন। সে ক্ষেত্রে তাঁকে এ ভাবে ঘর ছাড়তে বলা যায় না। তাঁর অভিযোগ, এই ঘটনায় শুধু সাংসদের নিরাপত্তা নয়, মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। মহুয়া স্পিকারের কাছে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করার আর্জি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, এ ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ করা প্রয়োজন। তা না হলে সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল এনে মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর উদ্যোগেরও কোনও অর্থ থাকে না বলে মন্তব্য করেছেন কৃষ্ণনগরের সাংসদ।

একটি মামলায় নিরাপত্তা চেয়ে মহুয়া মৈত্র সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তবে তাঁর সেই শীর্ষ আদালত আবেদন খারিজ করে দেয়। শুনানির সময় মৌখিক ভাবে বিচারপতি মন্তব্য করেন, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা গুলির সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। সাংসদ হয়ে মহুয়া কেন ডিম ছোড়ার মতো ঘটনায় ভয় পাচ্ছেন, তা নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন। একই সঙ্গে মহুয়াকে সশরীরে থানায় হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। সেই নির্দেশ মেনেই তৃণমূল সাংসদ কৃষ্ণনগরে গিয়েছিলেন। শুক্রবার রাতে ঘটনাক্রমের মধ্যেই মহুয়া সমাজমাধ্যমে একাধিক ‘লাইভ’ এবং ভিডিয়োবার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে সুপ্রিম কোর্টের মৌখিক পর্যবেক্ষণের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিরাপত্তা চাইতে গিয়েছিলাম। আদালত আমাকে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে বলেছে। আমি তা-ই করছি।’’ তবে একই সঙ্গে কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশের কথাও মহুয়া প্রশাসনকে মনে করিয়ে দেন। তাঁর দাবি, হাই কোর্ট পুলিশকে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধেই রাতে তাঁকে ‘হেনস্থা’ করার অভিযোগ তোলেন তিনি। এ বিষয়ে ফের মহুয়া আদালতের দ্বারস্থ হতে পারেন।

অভিযোগ, বিজেপির কৃষ্ণনগর এক নম্বর মণ্ডলের যুবমোর্চা নেতা রাজু রক্ষিতের নেতৃত্বে কয়েক জন রাতে সার্কিট হাউসের সামনে জমায়েত করেছিলেন। মহুয়া মৈত্র সমাজমাধ্যমে যে ভিডিয়োটি শেয়ার করেছেন, সেখানে রাজুকে বলতে শোনা যায়, মহুয়া সার্কিট হাউসে এসেছেন জানতে পেরেই তাঁরা সেখানে গিয়েছিলেন। সনাতন ধর্ম নিয়ে মহুয়ার কথিত ‘কুরুচিকর মন্তব্য’ এবং দেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে তাঁর ‘কুৎসা’র প্রতিবাদেই এই কর্মসূচি বলে তিনি দাবি করেন। ভিডিয়োয় রাজুকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘‘মহুয়া মৈত্র সার্কিট হাউসে এসেছেন খবর পেয়ে আমরা এসেছি। উনি সনাতন ধর্ম নিয়ে যে সমস্ত কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন, তার বিরুদ্ধে আমাদের এই প্রতিবাদ। দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ে উনি কুৎসা করছেন। সৎসাহস থাকলে দিনের আলোয় সামনে আসতেন। তা না-করে রাতে লুকিয়ে সার্কিট হাউসে এসেছেন। উনি যে প্রান্তেই যান, কৃষ্ণনগরবাসী ওঁকে ছাড়বেন না। বিজেপি ওঁকে ছাড়বে না।’’ যদিও এই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি এখন কলকাতা ডট কম।

মহুয়ার পাশে দাঁড়িয়ে রাতেই পোস্ট করেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পোস্টে লেখেন, ‘‘রাতবিরেতে একজন মহিলা সাংসদকে সার্কিট হাউস ছেড়ে দিতে বলা হচ্ছে। আর আগামী কাল সকালে বিজেপি নেতারা দেশবাসীর সামনে দাঁড়িয়ে মহিলাদের উন্নয়নের কথা বলবেন। মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারীশক্তির উদ্‌যাপনের কথা বলবেন, আবার রাষ্ট্রের শক্তি ব্যবহার করে আপনার বিরুদ্ধে যাওয়া কোনও মহিলাকে ভয় দেখাবেন এটা চলতে পারে না। এটাকে কর্তৃত্ব বলে না, নিরাপত্তাহীনতা বলে।’’ অভিষেক আরও বলেন, ‘‘যখন কোনও সরকার এতটাই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে যে, সাধারণ মর্যাদা রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন আসলে সেই সরকারই নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে ফেলে। যে মহিলাকে তারা অপমান করছে, তাঁর ভাবমূর্তি নষ্ট হয় না।’’


Share