Air India Flight

মাঝ আকাশে ৩০০ ফুট নীচে নামল এয়ার ইন্ডিয়ার বিমান! ব্ল্যাক বক্সে চাঞ্চল্যকর তথ্য, চার সেকেন্ড অকেজো নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বক্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গিয়েছে, এয়ারবাস এ-৩২০ জেটলাইনারটি আচমকাই প্রায় ৩০০ ফুট নীচে নেমে যাওয়ার সময় প্রায় চার সেকেন্ডের জন্য এলিভেটর ও আইলরন-সহ বিমানের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছিল।

এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ০১:২১

তাইল্যান্ডের ফুকেত থেকে দিল্লিগামী এয়ার ইন্ডিয়ার যে বিমানটি গত মঙ্গলবার মাঝ আকাশে বিপত্তির মুখে পড়েছিল, তার ‘ডিজিটাল ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার’ বা ব্ল্যাক বক্স পরীক্ষা করে চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্ল্যাক বক্সের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গিয়েছে, এয়ারবাস এ-৩২০ জেটলাইনারটি আচমকাই প্রায় ৩০০ ফুট নীচে নেমে যাওয়ার সময় প্রায় চার সেকেন্ডের জন্য এলিভেটর ও আইলরন-সহ বিমানের গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যত অকেজো হয়ে পড়েছিল। একই সময়ে তিনটি হাইড্রলিক সিস্টেম সাময়িক ভাবে বিকল হয়ে যাওয়ায় বিমানের ডানার স্পয়লারগুলিও কাজ করা বন্ধ করে দেয়।

এলিভেটর বিমানের হরাইজ়ন্টাল স্টেবিলাইজ়ারের সঙ্গে যুক্ত একটি নিয়ন্ত্রণপৃষ্ঠ, যা বিমানের ‘পিচ’ অর্থাৎ নাক উপরে বা নীচে ওঠানামার গতি নিয়ন্ত্রণ করে। অন্য দিকে, আইলরন থাকে ডানার পিছনের প্রান্তে। এটি বিমানের ‘রোল’ বা ডান-বাঁ দিকে কাত হওয়ার গতি নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। বিমানের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা হল হাইড্রোলিক সিস্টেম। বিশেষ তরলের উচ্চচাপ ব্যবহার করে এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ল্যান্ডিং গিয়ার, ব্রেক এবং ফ্লাইট কন্ট্রোল সারফেসের মতো ভারী ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ পরিচালিত হয়। পাইলট বা তাঁর সহকারী এই ব্যবস্থার সাহায্যেই বিমানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পরিচালনা করেন। এ ছাড়া, স্পয়লার হল বিমানের ডানার উপরের অংশে থাকা বিশেষ ধরনের ফ্ল্যাট প্যানেল। উড়ান বা অবতরণের সময় ডানা থেকে উৎপন্ন ঊর্ধ্বমুখী টান কমানো এবং বায়ুপ্রবাহে বাধা তৈরি করে বিমানের গতি নিয়ন্ত্রণে এটি সাহায্য করে। অর্থাৎ, এই গুরুত্বপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাগুলির একাধিকটি সাময়িক ভাবে বিকল হয়ে যাওয়ায় ফুকেত থেকে দিল্লিগামী বিমানটিতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এয়ার ইন্ডিয়ার ওই উড়ানটিতে সে দিন মোট ১৩৭ জন যাত্রী এবং আট জন বিমানকর্মী ছিলেন। আচমকা তীব্র ঝাঁকুনির ঘটনায় অন্তত ২৪ জন আহত হন। দুর্ঘটনার সময় পাইলটের অবস্থান এবং তাঁর আচরণ নিয়েও নানা দাবি সামনে এসেছে। ঝাঁকুনির জেরে তিনি আসনচ্যুত হয়েছিলেন কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদিও ঘটনার সময় পাইলটের আচরণ স্বাভাবিক ছিল না বলেও কয়েকজন দাবি করেছেন। ঘটনাটি নিয়ে তদন্ত এখনও চলছে। বিমান অবতরণের পর দুই পাইলটের ডোপ পরীক্ষা করা হয়। সূত্রের দাবি, ক্যাপ্টেনের প্রাথমিক পরীক্ষার রিপোর্ট পজ়িটিভ আসে। পরবর্তী পরীক্ষাতেও একই ফল পাওয়া গিয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে ডোপ টেস্টের ফলের সঙ্গে বিমানের আচমকা উচ্চতা কমে যাওয়ার কোনও সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনও তদন্তসাপেক্ষ। এয়ার ইন্ডিয়ার এআই২৩৭৯ উড়ানটি ফুকেত থেকে ওড়ার সময় কোনও সমস্যা ছিল না। কিন্তু কিছু সময় পরই বিমানে আচমকা তীব্র ঝাঁকুনি শুরু হয়। বিমান পরিষেবার পরিভাষায় এই ঘটনাকে ‘এয়ার টার্বুল্যান্স’ বলা হয়। আবহাওয়ার আচমকা পরিবর্তন বা দুর্যোগের কারণে আকাশপথে এমন তীব্র ঝাঁকুনি তৈরি হতে পারে। যাত্রাপথে বিমানগুলির এই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। সাধারণত টার্বুল্যান্সের সম্ভাবনা বুঝতে পারলে পাইলট আগে থেকেই যাত্রীদের সতর্ক করেন এবং সিটবেল্ট বেঁধে রাখার ঘোষণা করা হয়। কিন্তু অভিযোগ, এয়ার ইন্ডিয়ার দিল্লিগামী ওই বিমানে ঝাঁকুনির আগে এ বিষয়ে কোনও সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। ফলে অনেক যাত্রী সিটবেল্ট না বাঁধা অবস্থায় ছিলেন এবং আচমকা ঝাঁকুনির জেরে আহত হন।

বেলা সওয়া ১১টা নাগাদ দিল্লিতে অবতরণের কথা ছিল বিমানটির। তবে ‘এয়ার টার্বুল্যান্স’-এর কারণে কিছুটা দেরিতে দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সেটি নিরাপদেই অবতরণ করে। এরপর বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডিজিসিএ বিমানটি থেকে ককপিট ভয়েস রেকর্ডার এবং ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার বা ‘ব্ল্যাক বক্স’ সংগ্রহ করে তদন্ত শুরু করে। যদিও তদন্তের বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু জানানো হয়নি। ডিজিসিএ সূত্রে খবর, ব্ল্যাক বক্সের প্রাথমিক পরীক্ষায় উঠে এসেছে, প্রায় চার সেকেন্ডের জন্য বিমানের অটোপাইলট ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। সেই সময় কো-পাইলট বিমানটি চালাচ্ছিলেন। অটোপাইলট বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর তিনি ‘সাইড স্টিক’ সামনে ঠেলে দেন। মনে করা হচ্ছে, এয়ারবাস এ-৩২০-এর কন্ট্রোল সিস্টেম থেকে ককপিটে ‘স্টল সতর্কবার্তা’ আসার পরই তিনি এই পদক্ষেপ করেন। ‘স্টল’ হল এমন একটি সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি, যখন বিমানের ডানাগুলি সেটিকে আকাশে ধরে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ‘লিফ্‌ট’ তৈরি করতে পারে না। এই পরিস্থিতিতে প্রচলিত পরিচালন পদ্ধতি অনুযায়ী, বিমানকে নীচে নামিয়ে গতি ও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হয়। সেই কারণেই কো-পাইলট সাইড স্টিক সামনে ঠেলে বিমানটিকে নীচে নামানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে মনে করা হচ্ছে। তবে রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই কয়েক সেকেন্ডে বিমানের হাইড্রলিক ব্যবস্থাও কাজ না করায় কো-পাইলটের সেই প্রাথমিক চেষ্টা সফল হয়নি। ব্ল্যাক বক্সের তথ্য খতিয়ে দেখে ঘটনার প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা।


Share