Taslima Nasrin

তাড়িয়েছিল সিপিএম, ঢুকতে দেয়নি তৃণমূলও! দীর্ঘ ২০ বছর পরে শহরে পা রাখবেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন, প্রস্তুতি শুরু

তৃণমূল জমানাতেও তাঁর বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। লেখিকাকে ফিরিয়ে আনাতে তারাও কোনও উদ্যোগ নেয়নি। সিপিএম জমানার অলিখিত নির্দেশ বহাল থাকে। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর কলকাতা ফেরার একাধিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৫ জুলাই ২০২৬ ১০:৫৩

‘ভোটব‍্যাঙ্ক’ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই তসলিমা নাসরিনকে রাজ‍্য থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল সিপিএম। ২০১১ সালে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরেও সিপিএমের দেখানো পথেই হেঁটেছে। এ বার পালাবদল হতেই রাজ‍্যে ফিরছেন লেখিকা তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ অগাস্ট রবীন্দ্র সদনে তসলিমা একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসছেন বলে জানা গিয়েছে।

আগামী ১ অগাস্ট রবীন্দ্র সদনে মৌলবাদবিরোধী কবি-লেখকেরা সাহিত্য অনুষ্ঠানে আয়োজন করেছেন। সেই অনুষ্ঠানেই যোগ দিতে তসলিমা আসছেন বলে জানা গিয়েছে। সূত্রের খবর, অনুষ্ঠানে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও উপস্থিত থাকতে পারেন। তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে একই মঞ্চে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর। আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাই তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

সামাজমাধ‍্যমে লেখিকা তসলিমা নাসরিন নিজেও সে কথা জানিয়েছেন। তিনি জালিয়েছেন, তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে সেক্যুলার মিশন এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড বাংলাদেশ ফ্রিডম ফাইটার্স ফাউন্ডেশন। আয়োজকদের বক্তব্য, মৌলবাদের বিরুদ্ধে তসলিমার দীর্ঘদিনের অবস্থান এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। আয়োজকদের অন্যতম প্রতিনিধি মোহিত রায় বলেন, “তসলিমার পশ্চিমবঙ্গে আসার ক্ষেত্রে কোনও আইনি বাধা নেই। আগের দুই রাজ্য সরকার মৌলবাদী শক্তির চাপে নতি স্বীকার করেছিল। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তাই আমরা তাঁকে আবার কলকাতায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছি।”

মোহিত রায় আরও জানান, “এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য জড়িত নয়। তবে তাঁর নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজ্য সরকার তাঁর সফরে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।” সেক্যুলার মিশনের পক্ষে কলকাতা হাই কোর্টের এক আইনজীবী সামাজমাধ্যমে লিখেছেন, “সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে পরাজিত করে অবশেষে তসলিমা নাসরিন কলকাতায় ফিরছেন।”

তসলিমার এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০০৭ সালে সিপিএম জমানায় তাঁর বই ‘দ্বিখণ্ডিত’-কে কেন্দ্র করে কলকাতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হয়। পরে তাঁকে সিপিএম সরকার কলকাতা ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ দেয়। তাঁর বইয়ের ওপরেও নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

পরবর্তীকালে তৃণমূল জমানাতেও তাঁর বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। লেখিকাকে ফিরিয়ে আনাতে তারাও কোনও উদ্যোগ নেয়নি। সিপিএম জমানার অলিখিত নির্দেশ বহাল থাকে। নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর কলকাতা ফেরার একাধিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়।

রাজ‍্য বিজেপির মুখপাত্র অধ্যাপক বিমলশঙ্কর নন্দ বলেন, “সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণেই আগের দুই সরকার তসলিমা নাসরিনকে পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে দেয়নি। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ম মেনে ভারতে বসবাস করছেন। তাঁর পশ্চিমবঙ্গে আসার ক্ষেত্রে কোনও নিষেধাজ্ঞা নেই।” রাজ্যে ক্ষমতায় আসার আগে ‘বিশেষ ভোটব‍্যাঙ্ক’-কে তোষণ নিয়ে একাধিক বার তৃণমূল এবং সিপিএমকে নিশানা করেছিলেন রাজ‍্যের মুখ‍্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

লেখিকা তসলিমা নাসরিন মূলত নারীর অধিকার, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক ভাবে তাঁর পরিচিত রয়েছে। তাঁর লেখালেখির কারণে বহু বিতর্কেরও জন্ম দিয়েছেন। ইসলাম ধর্মের রক্ষণশীল ব্যাখ্যার সমালোচনা করায় তাঁকে বাংলাদেশত্যাগ করতে হয়েছিল। ইউরোপে দীর্ঘদিন থাকার পর তিনি ভারতে আসেন। ২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বসবাস করেন।

বর্তমানে তসলিমার সুইডেনের নাগরিকত্ব রয়েছে। গত ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে তাঁর আবাসিক অনুমতির মেয়াদ শেষ হওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন লেখিকা। পরে এই বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন। তাঁর হস্তক্ষেপের পর ভারতে থাকার আবাসিক অনুমতি নবায়ন করা হয়। তসলিমা নাসরিন বহুবার বলেছেন, তাঁর হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের শহর কলকাতা। কিন্তু ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীর বিরোধিতা এবং তার জেরে নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণে এতদিন তিনি ফিরতে পারেননি।


Share