Education

নবম-একাদশ নয়, আরও কম বয়স থেকেই যৌন শিক্ষা! সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের পর স্কুল-কলেজের সিলেবাসে 'কম্প্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন' আনতে বড় সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের

এই পাঠক্রম কেবল জীববিজ্ঞান বা বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ‘সম্মতি’, ব্যক্তিগত সীমানা এবং শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

সুপ্রিম কোর্ট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ১৪ জুলাই ২০২৬ ০২:০৯

নবম বা একাদশ শ্রেণি থেকে নয়, বরং আরও কম বয়স থেকেই পড়ুয়াদের যৌনতা ও জীবনদক্ষতা বিষয়ে শিক্ষা দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’-এর পার্থক্য শেখানোর প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে শীর্ষ আদালত যে সুপারিশ করেছিল, তা মেনে দেশের স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে শীঘ্রই ‘কমপ্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে কেন্দ্র সরকার।

সুপ্রিম কোর্টে দাখিল করা এক হলফনামায় কেন্দ্র জানিয়েছে, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের যৌন স্বাস্থ্য, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং যৌন নির্যাতন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক, তথ্যভিত্তিক ও বয়স-উপযোগী শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে গঠিত একটি বিশেষ কমিটির সুপারিশ গ্রহণ করা হয়েছে। এই পাঠক্রম কেবল জীববিজ্ঞান বা বিজ্ঞান শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ‘সম্মতি’, ব্যক্তিগত সীমানা এবং শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আসতে চলেছে এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। দীর্ঘদিনের সামাজিক ট্যাবু ও সংকোচ কাটিয়ে স্কুল ও কলেজের মূল পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হতে চলেছে ‘যৌন শিক্ষা’ বা কম্প্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন।

চিকিৎসক ও সমাজকর্মী ডাঃ রুদ্রাণী দেবীর ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর এই জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছিল। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের যৌনতা, সম্মতির গুরুত্ব, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে সারা দেশে একটি অভিন্ন ও বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা নীতি চালু করা জরুরি।

শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, যৌন শিক্ষার সূচনা শুধুমাত্র নবম বা দশম শ্রেণি থেকে হলে তা যথেষ্ট নয়। বরং শিশুদের প্রাথমিক স্তর থেকেই বয়স-উপযোগী যৌন শিক্ষা ও সচেতনতা দেওয়া প্রয়োজন। বিচারপতিদের মতে, বয়ঃসন্ধিকালে শরীরে ও মনে যে পরিবর্তন আসে, হরমোনজনিত রূপান্তর, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা সম্পর্কে কিশোর-কিশোরীদের স্পষ্ট ও বৈজ্ঞানিক ধারণা থাকা জরুরি। আদালতের পর্যবেক্ষণ, সময়মতো সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে অনেক কিশোর-কিশোরী অজ্ঞতাবশত এমন কিছু কাজে জড়িয়ে পড়ে, যা পরে পকসো আইনের আওতায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। তাই প্রাথমিক স্তর থেকেই উপযুক্ত সচেতনতা গড়ে তোলা হলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব।

সুপ্রিম কোর্টে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক এবং শিক্ষা মন্ত্রক যৌথভাবে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। এই প্রক্রিয়াটি দেশজুড়ে সঠিকভাবে কার্যকর করার জন্য ২৬ সদস্যের একটি জাতীয় বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। ইতিমধ্যেই ওই কমিটি একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে (সিলেবাসে) কম্প্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি শিশুদের জন্য শিশুদের যৌন নির্যাতন সম্পর্কে সচেতনতা বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া বয়সভিত্তিক ও বৈজ্ঞানিক তথ্যনির্ভর পাঠ্যক্রম তৈরির সুপারিশ করা হয়েছে। শিক্ষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যাতে তাঁরা সংবেদনশীল বিষয়গুলি যথাযথভাবে পড়াতে পারেন। ফাউন্ডেশনাল বা প্রাথমিক স্তরের শিশুদের শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের পরিচ্ছন্নতা, সুরক্ষা এবং ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সহজ ভাষায় শেখানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল ও কলেজে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দু'দিন ১৫ থেকে ২০ মিনিটের একটি বিশেষ সেশন চালুর সুপারিশ করা হয়েছে, যা পরিচালনা করবেন একজন নির্দিষ্ট বিশেষজ্ঞ শিক্ষক।

এ ছাড়া, শুধু পড়ুয়া নয় অভিভাবকদের সঙ্গেও বিশেষ সেশনের আয়োজন করার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। যাতে সন্তানদের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনগুলি অভিভাবকরা সহজ ও স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য নিয়মিত বিশেষ সচেতনতা শিবিরের আয়োজন করা হবে।

কেন্দ্রের প্রস্তাবিত 'কমপ্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন' শুধুমাত্র প্রজনন প্রক্রিয়া বা যৌন সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এই পাঠ্যক্রমে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, 'গুড টাচ' ও 'ব্যাড টাচ'-এর ধারণা, সম্মতির গুরুত্ব, স্বাস্থ্যকর সম্পর্ক ও পারস্পরিক সম্মান, অনলাইন নিরাপত্তা ও সাইবার শোষণ, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক তথ্য, পাশাপাশি শিশুদের যৌন নির্যাতন চিহ্নিত করা এবং অভিযোগ জানানোর উপায় সম্পর্কে বয়স-উপযোগী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে।

কেন্দ্রের মতে, ভারতে যৌন শিক্ষা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক সংকোচ ও ট্যাবুর পরিবেশ রয়েছে। শুধু 'গুড টাচ' ও 'ব্যাড টাচ'-এর মধ্যে বিষয়টি সীমাবদ্ধ থাকায় বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োজনীয় সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না। এর ফলে বহু শিশু ও কিশোর-কিশোরী সঠিক বৈজ্ঞানিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা চিহ্নিত করতে বা অভিযোগ জানাতে পারছে না। তাই বয়স-উপযোগী ও বৈজ্ঞানিক যৌন শিক্ষা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হলে সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিশুদের নিরাপত্তা আরও জোরদার হবে।

কেন্দ্র সুপ্রিম কোর্টকে জানিয়েছে, বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশ কার্যকর করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আদালতও বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি নথিভুক্ত করেছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণ, যথাযথ যৌন শিক্ষার অভাবের কারণে শিশু যৌন নির্যাতনমূলক কনটেন্টের বিস্তার এবং যৌন অপরাধের প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। আদালতের মতে, ‘সম্মতি’ ও ‘পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ’-এর সঠিক ধারণা সমাজে ছড়িয়ে দিতে পারলে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার পথ আরও সুগম হবে এবং যৌন অপরাধের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

জাতীয় শিক্ষানীতির নির্দেশিকা মেনে ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (এনসিইআরটি) খুব শীঘ্রই নতুন এই পাঠ্যক্রমের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রকাশ করবে বলে জানা গিয়েছে।

ভারতে যৌন শিক্ষা দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কিত একটি বিষয়। বিভিন্ন রাজ্যে এটি সীমিত পরিসরে বা জীববিজ্ঞানের পাঠের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, জাতীয় স্তরে কম্প্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশনকে একটি স্বতন্ত্র ও বিস্তৃত পাঠ্যক্রম হিসেবে চালুর উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শিশুদের যৌন নির্যাতন প্রতিরোধ, বয়স-উপযোগী ও বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক শিক্ষা প্রদান এবং নিরাপদ আচরণ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।

এই প্রতিবেদনে কম্প্রিহেনসিভ সেক্স এডুকেশন কী, স্কুলে যৌন শিক্ষা চালুর প্রয়োজনীয়তা, নতুন সিলেবাসে কোন কোন বিষয় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, 'সম্মতি' শিক্ষা বলতে কী বোঝায়, গুড টাচ ও ব্যাড টাচের ধারণা কী, চাইল্ড সেক্সসুয়াল অ্যাবিউজ প্রতিরোধে এই শিক্ষা কীভাবে কার্যকর হতে পারে, যৌন শিক্ষা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট কী নির্দেশ দিয়েছে এবং কোন শ্রেণি থেকে এই শিক্ষা চালু হতে পারে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।


Share