Assembly Election

ডায়মন্ড হারবার মডেল! কোনও বুথের ভিডিয়ো নেই, আবার কোথাও একই লোক বারবার ভোট দিয়েছে, কী উঠে এসেছে কমিশনের রিপোর্টে

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন নির্বাচন কবে হয়েছে তা অনেকেই মনে করতে পারছে না। তাঁরা এ-ও বলছে, কমিশন এতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই বিক্ষিপ্ত অশান্তি ছাড়া গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ হয়েছে।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে জাহাঙ্গির খান।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ মে ২০২৬ ১২:২৪

‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’। ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের পুননির্বাচন করানোর নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ভোটগ্রহণের দিন ব‍্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কমিশন যে রিপোর্টের ভিত্তিতে পুননির্বাচনের দাবি করেছে, তাতে চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে।

দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণের দিন একটি বুথের ইভিএমের ওপরে বিরোধী দলের বোতামের ওপরের টেপ লাগানো ছবি ভাইরাল হয়। অভিযোগ ওঠে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠ তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের অনুগামীদের বিরুদ্ধে। পরের দিন কমিশনের স্পেশাল অবজার্ভার সুব্রত গুপ্ত নিজে ওই কেন্দ্রের স্ট্রং-রুমে গিয়ে সবকিছু খতিয়ে দেখেন। তার পরে নির্বাচন কমিশনের কাছে রিপোর্ট জমা দেন।

রিপোর্টে জমা দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের ২৩৮ থেকে ২৬১ নম্বর, এই ২২টি বুথে অনুমোদনহীন ব্যক্তিরা ভোটকক্ষের মধ্যে বারবার প্রবেশ করছে। ভোটকর্মীরা বারবার বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছেন। পরে আবার ভোটকক্ষে প্রবেশ করছেন। যাতে নির্বাচনের প্রক্রিয়াগত লঙ্ঘন হয়েছে বলে ধরা হয়েছে। ৭৮ নম্বর বুথে একাধিক সময়ের ভিডিয়ো ফুটেজ নেই। ৮০ নম্বর বুথে তৃতীয় পোলিং অফিসার বারবার ভোটকক্ষে প্রবেশ করে ভোটারদের কোথায় ভোট দিতে হবে তা নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ১৮২ নম্বর বুথে এক মহিলা ও দুই পুরুষের দ্বারা দীর্ঘ সময় ধরে একাধিক বার ভুয়ো ভোটদানের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ১৬০ নম্বর বুথে বিভিন্ন সময়ে একাধিক ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, সহচরেরা ভোটারদের হয়ে ভোট দিচ্ছেন।

২২৯ নম্বর বুথে ভোটগ্রহণ শুরু থেকে বিকেল ৩টে ৪১ মিনিট পর্যন্ত কোনো ভিডিয়ো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ১৪৪ নম্বর বুথে ভোটকর্মীরা বারবার ভোটকক্ষে প্রবেশ করেছেন। সেই সময় সময়ে একাধিক ব্যক্তি ভোটকক্ষে উপস্থিত ছিলেন। ২২৭ নম্বর বুথে সকাল ৭টা ২২ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ৩৯ মিনিট পর্যন্ত ভিডিয়ো ফুটেজই পাওয়া যায়নি। সেখানেও ভোটারদের হয়ে অন‍্যকেউ বারবার ভোটদান করেছে। ২৩১ নম্বর বুথে একাধিক সময়ের ভিডিয়ো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সেখানেও একই ছবি ধরা পড়েছে। ২৪৫ নম্বর বুথে কোনও ভোটকর্মী দীর্ঘক্ষণ ছিলেন না। ভোটারদের সঙ্গে অন্য কেউ এসে বাধাহীন ভাবে ভোট দিয়ে দিচ্ছেন। 

২৩৫ নম্বর বুথে সকাল ১০টা ৫৫ থেকে ১১টা ৫৯ পর্যন্ত ভিডিয়ো পাওয়া যায়নি। সেখানেও একই ব্যক্তি বারবার ভোটকক্ষে প্রবেশ করেছেন। একই সময়ে দু’জন ভোটার ভোটকক্ষে ছিলেন। সেখানেও অনুমোদন ছাড়াই ব্যক্তিকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়েছে। ২৩২ নম্বর বুথে পোলিং এজেন্ট ভোটারের হয়ে ভোট দিয়েছেন। ২৪৭ নম্বর বুথে একই ব্যক্তি একাধিক বার ভোটকক্ষে প্রবেশ করে ভোট দিয়েছেন। ২২৪ নম্বর বুথে সারাদিন ধরে বিপুল সংখ্যক ক্ষেত্রে সহচররা ভোটারদের হয়ে ভোট দিয়েছেন। একই সময়ে একাধিক ব্যক্তি ভোটকক্ষে প্রবেশ করেছে। একই ব্যক্তি বারবার ভোট দিয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। পোলিং এজেন্ট বারবার ভোটকক্ষে গিয়ে ভোট দিয়েছেন। ২২৬ নম্বর বুথে সকাল ১১টা থেকে দুপুর ১টা ১২ মিনিট এবং ১টা ১৮ থেকে বিকেল ৪টে ৪৩ মিনিট পর্যন্ত ভিডিয়ো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ২৩০ নম্বর বুথে সকাল ১১টা থেকে থেকে দুপুর ২টো ৩০ মিনিট পর্যন্ত ভিডিয়ো ফুটেজ নেই। সেখানেও রিগিং হয়েছে।

১৬১ এবং ১৬৩ নম্বর বুথে অভিযোগ জমা পড়া থেকে পদক্ষেপ নেওয়া পর্যন্ত সময়ে সেক্টর অফিসার বা প্রিসাইডিং অফিসারের কোনো কার্যকলাপ ভিডিয়োতে দেখা যায়নি। যে পদক্ষেপ তাঁরা নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে, তা-ও সম্পূর্ণ অসত্য বলে কমিশনের মনে হয়েছে। ১০, ৭৬, ৭৭, ৯৯, ১০০, ১১৮, ১৩৮, ১৪০, ১৪৬, ১৫৬, ১৬৫, ১৮৬ এবং ১৯৩ নম্বর বুথে দুপুর ২টো থেকে রাত ৮টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত রিটার্নিং অফিসার কোনও ভিডিয়ো ফুটেজ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ভয় দেখানো ও ভোটারদের বাধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগগুলি ভিডিয়ো না থাকায় যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে কমিশনের কাছে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। 

গত লোকসভা নির্বাচনে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে আট লাখ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ফলতা কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছিলেন। এই কেন্দ্র থেকে এক লক্ষ ৮৩ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন তিনি। এ বারে বিধানসভা নির্বাচনে তাঁরই ঘনিষ্ঠ জাহাঙ্গির খান টিকিট পেয়েছেন। ভোটের আগে তাঁর অনুগামীদের বিরুদ্ধে ভোটারদের প্রভাবিত এবং বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভয় দেখানোর অভিযোগ উঠেছিল।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২১ মে। ওই দিন সকাল ৭টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হবে। আগামী ২৪ মে, রবিবার ওই কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা হবে। অর্থাৎ আগামী ৪ মে ২৯৩টি আসনের জন্য ভোটগণনা হতে চলেছে।

নির্বাচন কমিশন এ-ও জানিয়েছে, ওই কেন্দ্রের জন‍্য কে নির্বাচিত হবেন তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৫৮ এবং ৫৮এ ধারা প্রয়োগ করেছে। কারণ সেখানে, ব‍্যপক হারে নির্বাচনে অনিয়ম হয়েছে। তাই ওই কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা সম্ভব নয়। পুননির্বাচন করার পরেই ওই কেন্দ্রের ফলাফল ঘোষণা করা হবে। 

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন নির্বাচন কবে হয়েছে তা অনেকেই মনে করতে পারছে না। তাঁরা এ-ও বলছে, কমিশন এতো কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই বিক্ষিপ্ত অশান্তি ছাড়া গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ হয়েছে।


Share