TMC Political Crisis

‘আপনাদের দেখিয়ে আমেরিকায় চিকিৎসা করাতে গিয়েছে,’ মমতাকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে কমিশনের রিপোর্ট পেশ মুখ্যমন্ত্রীর

মুখ‍্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আপনারা যদি নতুন করে এফআইআর করতে চান তাহলে করতে পারেন। তাহলেও এই সরকার অনুমতি দেবে। আপনারা যদি ক্ষতিপূরণ চান, তা-ও দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী রিলিফ ফান্ড থেকে তা দেব।”

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২০ জুলাই ২০২৬ ১০:৩৮

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শহিদ পরিবারদের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করেছেন। তাঁদের সামনে রেখে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বৃত্তশালী হয়েছে। কালীঘাট এলাকায় ৩৪টি প্লটের মালিক হয়েছে। সোমবার বিধানসভায় অধিবেশনে ২১ জুলাইয়ে নিয়ে কমিশনের রিপোর্ট পেশ করেছেন রাজ্যের মুখ‍্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানেই তৃণমূলকে নিশানা করে একাধিক আক্রমণ শানিযেছেন।

১৯৯৩ সাল‍ের ২১ জুলাই কলকাতায় গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ১৩ জন যুব কংগ্রেস কর্মী নিহত হন। সেই সময় যুব কংগ্রেসের নেত্রী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নেতৃত্বেই মহাকরণ অভিযানের ডাক দেওয়া হয়। ক্ষমতায় আসার পরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন মমতা। সেই কমিশন রিপোর্ট দিলেও ১৫ বছরে তা প্রকাশ করেনি তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সরকার। অথচ এই দিনটিকে স্মরণ করে বছরের পর বছর শক্তি প্রদর্শনের একটি মঞ্চ হয়ে উঠেছিল।

সোমবার সকালে বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, এ দিন বিকেলেই ২১ জুলাই নিয়ে কমিশনের রিপোর্ট বিধানসভায় পেশ করে জনসাধারণের কাছে আনবেন। নির্ধারিত সময় মতোই তিনি ওই রিপোর্ট পেশ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই কমিশন সুপারিশ দেওয়ার আগে মোট ৪৪ জনকে ডেকে বয়ান নিয়েছিল। যাঁদের বয়ান নেওয়া হয়েছিল, তাঁরা হলেন— প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, প্রাক্তন মুখ‍্যসচিব এন কৃষ্ণমূর্তি, স্বরাষ্ট্রসচিব মনীশ গুপ্ত, প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার তুষারকান্তি তালুকদার, যুগ্ম কমিশনার কনওয়ালজিৎ সিংহ, যুগ্ম কমিশনার রাজকমল জহুরী, অতিরিক্ত কমিশনার দীনেশ বাজপেয়ী, হেস্টিংস থানার ওসি প্রবীরকুমার দাস, ডেপুটি কমিশনার (হেডকোয়ার্টার) ডিএন বিশ্বাস, ডেপুটি কমিশনার (সেন্ট্রাল) সিদ্ধার্থ রায়, এক সার্জেন্ট, স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডেপুটি কমিশনার কিরিটি সেনগুপ্ত। এ ছাড়াও, সিপিএম নেতা বিমান বসু, সৌমেন মিত্র, প্রদীপ ভট্টাচার্য, মঞ্জুকুমার মজুমদার, প্রভাস ঘোষ, বিশ্বনাথ চৌধুরী, কীরণময় নন্দ, সরল দে, তপন শিকদার, শোভোনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, অনিন্দ্য জানা প্রমুখেরা সেই তালিকায় রয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেকে ওই দিনের ঘটনার সবচেয়ে বড় সাক্ষী হিসেবে দাবি করেন। কমিশন তাঁকে ডাকার প্রয়োজনই মনে করেনি। হয়ত আলাদা করে কমিশনকে বলে দিয়েছিলেন যে “আমাকে ডাকবেন না।” 

মুখ্যমন্ত্রী জানান, ঘটনায় তদন্তে যে কমিশন তৈরি হয়েছিল, তাঁরা অনেককে প্রশ্ন পাঠিয়েছিল। তাঁরা কমিশনকে উত্তরও দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে একজন উত্তর দিতে নাকোচ করে দেন। বলেছিলেন, ‘সাক্ষী দিতে যাব না’। তিনি রাজ্যের প্রাক্তন বিরোধী দলনেতা পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়। পঙ্কজবাবু ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ছিলেন। তিনি সেই সময় ইংরেজি একটি সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকারে লিখেছিলেন, “মনীশ গুপ্তই মূল চক্রান্ত করেছিল। তিনি ওই ঘটনার মূলচক্রী। কিন্তু ঘটনার অভিযুক্তই মমতার মন্ত্রীসভায় মন্ত্রী হিসেবে জন্ম নিল। কিন্তু কমিশন তাঁকে কেন ডাকল না তারাই বলতে পারবে। ক্ষমতার চাপেই হবে হয়তো এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।” একই কথা তদন্ত কমিশনকেও জানিয়েছিল বলে বিধানসভায় জানান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। 

এই তদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ রয়েছে, আইন মেনে ঘটনার তদন্ত হয়েছিল বলে কমিশন মনে করছে না। এই তদন্ত প্রক্রিয়া সরল ভাবে হয়েছে বলেও প্রতীয়মান হয় না। কারণ কমিশন রাজ‍্য সরকারর কাছ থেকে বেশিরভাগ রিপোর্টই তাঁদের কাছে আসেনি। তাই এই তদন্ত বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় বাইরে চলে গিয়েছে। এর ফলে পুলিশ যে গুলি চালিয়েছিল, তা প্রমাণিত হয় না। 

এর পাশাপাশি, কমিশন রিপোর্টে এ-ও উল্লেখ করেছে, তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তুষারকান্তি তালুকদারের সঙ্গে বাকি আধিকারিকদের বয়ানে বিস্তর অসামঞ্জস্য রয়েছে। কার নির্দেশে গুলি চলেছিল তা প্রকাশ‍্যে অস্বীকার করেছেন তিনি। মহাকরণ থেকে প্রয়োজনীয় তথ‍্য কেন পাওয়া যাচ্ছে না তা-ও মনে করা হয়নি। এই বিষয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “তখনকার মুখ্যমন্ত্রী যিনি ছিলেন, তিনি আগামীকাল ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে যাবেন। তিনি একটাও নথি দেননি। তদন্তকে এগিয়ে নিয়ে যেতে তথ‍্যই সরবারহ করেননি। কারণ ওনার বিদ‍্যুৎমন্ত্রী ফেঁসে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।”

কমিশন রিপোর্টে আরও স্পষ্ট করেছে, রাইটার্স বিল্ডিং থেকে অনেক দুরেই ঘটনাটি ঘটেছিল। তাই কমিশন মনে করছে, সেখানে পুলিশের গুলি চালানোর কোনও প্রয়োজনীতা ছিল না। মেয়ো রোড, ডোরিনা ক্রসিং, এসপ্লানেড রো, মেট্রো সিনেমার সামনে গুলি চালানোর ঘটনা অপ্রাসঙ্গিক। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, উস্কানিহীন বলেই কমিশন রিপোর্টে উল্লেখ করেছে। 

মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, কমিশন এ-ও জানিয়েছে, রাইটার্স বিল্ডিংয়ে কাগজপত্র যথাযথ ভাবে সংরক্ষণ করাটা রাজ‍্যের দায়িত্ব। তা রাজ্য সরকার করতে পারছে না। তিনি বলেন, “রাজ‍্য সেই দায়িত্ব পালন করেনি। তখন সিপিএম ছিল না। তৃণমূল ছিল। কমিশনের কথা মেনে সেই সব কাগজপত্র আইন মেনে সংরক্ষণ করা উচিত চিল। কাল যাঁরা ভাষণ দেবেন, তাঁদের ভূমিকা সেই সময় নেতিবাচক ছিল। উদাসীন ছিল। লালবাজারে যে সমস্ত কাগজপত্র হারিয়ে গিয়েছে তা নিয়ে তদন্ত করা উচিত ছিল। তাও করেননি।”

কমিশন আরও সুপারিশ করেছিল— যে সমস্ত কর্মীরা মারা গিয়েছিলেন তাঁরা ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য। কারণ তাঁরা একটি আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তাই এঁদের শহিদ হিসেবে গণ্য করা উচিত। তাই মৃতদের ২৫ লক্ষ এবং আহতদের পাঁচ লক্ষ করে টাকার সুপারিশ করে। শুভেন্দু বলেন, “কিন্তু মৃতদের দু’লক্ষ করে টাকা দিয়েছেন। আর আহতদের ১৫ হাজার টাকা দিয়েছেন। লজ্জা লাগে না? এর পরেও এ সব করেন। আমি এই রিপোর্ট পেশ করছি।”

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তৃণমূলকে কটাক্ষ করে জানান, আপনাদের দেখিয়ে এরা ব‍্যক্তিগত পদ নয়  বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়েছেন। হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের ৩৮টি প্লটের মালিক হয়েছেন। বড় বড় প্রাসাদের মালিক হয়েছেন। তাঁরা বিদেশ গেল, আমেরিকার জন হপকিনসে চোখের চিকিৎসা করালেন। চাটার্ড বিমানে চড়ল, হেলিকপ্টার চড়ল, বাড়ি-গাড়ি সব করলো— তাঁদের কাছ থেকে দূরে থাকুন।” 

এর পরেই মুখ‍্যমন্ত্রী আশ্বাস দিয়ে বলেন, “আপনারা যদি নতুন করে এফআইআর করতে চান তাহলে করতে পারেন। তাহলেও এই সরকার অনুমতি দেবে। আপনারা যদি ক্ষতিপূরণ চান, তা-ও দেওয়া হবে। মুখ্যমন্ত্রী রিলিফ ফান্ড থেকে তা দেব।”


Share