Ashok Lahiri

'ধর্মাশোক থেকে প্রান্তিক মুখ, বিজেপির প্রার্থী তালিকায় অশোক লাহিড়ীর অনুপস্থিতি ঘিরে জোর চর্চা

বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্তও অশোক লাহিড়ী আনুষ্ঠানিকভাবে জানতেন না, তাঁর আসন বালুরঘাটে অন্য কারও নাম চূড়ান্ত হয়েছে। তবে তাঁকে সরানোর চেষ্টা চলছে, এমন ইঙ্গিত তাঁর কাছে পৌঁছেছিল বলেই দলীয় সূত্রের দাবি। তবু সোমবার বিধাননগরে বিজেপি দফতরে সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর মুখে উদ্বেগ বা ক্ষোভের ছাপ দেখা যায়নি।

ডা: অশোক লাহিড়ী
নিজস্ব সংবাদদাতা, বালুরঘাট
  • শেষ আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২৬ ০৪:২৮

পাঁচ বছর আগে অশোক লাহিড়ী-কে বিজেপির কাছে অনেকেই ‘ধর্মাশোক’ বলে দেখতেন। শান্ত, পরিমিত, নীতিনিষ্ঠ এক মুখ হিসেবে। এখন প্রশ্ন উঠছে, কোনও বড় বিতর্ক বা স্পষ্ট ব্যর্থতা ছাড়াই তিনি কি দলীয় অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে সরে গেলেন? এই প্রশ্ন ঘুরছে বিজেপির অন্দরেই।

বিজেপির প্রথম দফার প্রার্থী তালিকা ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে পর্যন্তও অশোক লাহিড়ী আনুষ্ঠানিকভাবে জানতেন না, তাঁর আসন বালুরঘাটে অন্য কারও নাম চূড়ান্ত হয়েছে। তবে তাঁকে সরানোর চেষ্টা চলছে, এমন ইঙ্গিত তাঁর কাছে পৌঁছেছিল বলেই দলীয় সূত্রের দাবি। তবু সোমবার বিধাননগরে বিজেপি দফতরে সাংবাদিক বৈঠকে তাঁর মুখে উদ্বেগ বা ক্ষোভের ছাপ দেখা যায়নি। বরং স্বভাবসিদ্ধ সংযত ভঙ্গিতে তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর্থিক নীতির সমালোচনা করেন এবং রাজ্যের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশের বিশ্বাস ছিল, পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসা সম্ভব। সেই হিসাবেই সম্ভাব্য মন্ত্রিসভা মাথায় রেখে প্রার্থী বাছাই করা হয়েছিল। অর্থনীতিবিদ অশোক লাহিড়ীর পাশাপাশি বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও বুদ্ধিজীবীদেরও প্রার্থী করা হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি সরকার গঠন করতে পারেনি, আর এই ‘বিশিষ্ট মুখ’-দের বেশিরভাগই পরাজিত হন। ব্যতিক্রম ছিলেন অশোক, তিনি বালুরঘাট থেকে জয়ী হয়েছিলেন। পাঁচ বছর পর সেই তিনিই প্রথম তালিকাতেই বাদ পড়লেন। বালুরঘাটে তাঁর বদলে প্রার্থী করা হয়েছে স্থানীয় এক আইনজীবীকে বিদুৎ কুমার রায়-কে। এই সিদ্ধান্ত শুধু রাজনৈতিক মহলেই নয়, বিজেপির ভিতরেও বিস্ময় তৈরি করেছে। কারণ দিল্লির হস্তক্ষেপে শেষ মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলাবে, এমন আশাই করেছিলেন অনেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি।

দলীয় সূত্রে জানা যাচ্ছে, অশোক লাহিড়ীর জন্য দিল্লিতে ‘সম্মানজনক পুনর্বাসন’-এর পথ খোঁজা শুরু হয়েছে। নীতি আয়োগ, প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় বা কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণের কোনও গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁকে ফের আনার প্রস্তাব ঘুরছে। কারণ অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে—ভারত সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা এবং পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের সদস্য হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগও এখনও দৃশ্যমান। ১৪ মার্চ ব্রিগেডের জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর সভা শেষে যাঁদের সঙ্গে তিনি আলাদা করে কথা বলেন, তাঁদের মধ্যে অশোক ছিলেন অন্যতম। ফলে কেন্দ্রীয় স্তরে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমেনি বলেই মনে করা হচ্ছে। তবু টিকিট না-পাওয়ার কারণ হিসেবে উঠে আসছে স্থানীয় সংগঠনের সমীকরণ। বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীক্ষায় বালুরঘাটে অশোকের জনপ্রিয়তা খুব উঁচুতে ওঠেনি বলে দাবি দলীয় সূত্রের। পাশাপাশি স্থানীয় সাংগঠনিক নেতৃত্বের বড় অংশই সাংসদ ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের ঘনিষ্ঠ হওয়ায়, অশোকের পক্ষে সংগঠনের ভিতরে শক্তিশালী সমর্থন তৈরি হয়নি।

এখানেই প্রশ্ন উঠছে বিজেপির প্রার্থী বাছাই পদ্ধতি নিয়ে। শুধু সমীক্ষা ও সাংগঠনিক মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিলে কি অভিজ্ঞতা, ভাবমূর্তি এবং নীতিগত গ্রহণযোগ্যতার মতো বিষয়গুলি উপেক্ষিত হয়? দলেরই একাংশ মনে করছে, এতে সুশীল সমাজে ভুল বার্তা যাচ্ছে, বিশেষ করে এমন সময়ে, যখন ‘ভদ্রলোক’ বা কৃতী মানুষদের রাজনীতিতে আনার কথা প্রায়ই বলা হয়।

অশোক লাহিড়ী এখনও প্রকাশ্যে কোনও ক্ষোভ দেখাননি। তবে ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন, বালুরঘাট ছাড়া অন্য কোথাও থেকে ভোটে লড়ার ইচ্ছা তাঁর নেই। ফলে বিজেপির পরবর্তী তালিকাতেও তাঁর নাম থাকার সম্ভাবনা আপাতত ক্ষীণ। দলের একাংশ এখন চাইছে, তাঁর বিদায় যেন অপমানের নয়, মর্যাদার ছবি তৈরি করে। তাই দিল্লিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে তাঁকে ফের জাতীয় স্তরে আনার চেষ্টাই আপাতত সবচেয়ে সম্ভাব্য পথ বলে মনে করা হচ্ছে।


Share