Post Poll Violence

তৃণমূলের ভরাডুবি, দিকে দিকে দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর, আছাড়ে পড়ল স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ

একদিকে যখন জনরোষের মুখে পড়ছে তৃণমূল। অপর দিকে নাটকীয় মোড় নিয়েছে রাজ্য-রাজনীতি। খোদ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর থেকে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত। তার পরেও হার স্বীকার করতে নারাজ তিনি।

রুবিতে তৃণমূলের কার্যালয়ে ভাঙচুর।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ১১:০৪

বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হয়েছে। ২০৭টি আসন নিয়ে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করতে চলেছে। গেরুয়া ঝরে কার্যত খড়কুটোর মত উড়ে গিয়েছে ঘাসফুল শিবির। আর ভোট পর্ব মিটতেই দিকে দিকে জনরোষের মুখে পড়ল তৃণমূল। তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে জনরোষ আছড়ে পড়ল। আবার কোথাও তৃণমূল নেতা দেখে ‘চোর চোর’ স্লোগান উঠল। এরই মাঝে দুই বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে।

বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর কোচবিহার জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। গতকাল দিনহাটায় গণনাকেন্দ্রের বাইরে থেকে গাড়ি করে যাওয়ার সময় কোচবিহারের তৃণমূল সাংসদ জগদীশচন্দ্র বসুনিয়ার গাড়িতে হামলার অভিযোগ ওঠে। তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে স্থানীয়েরা জুতো ছুড়ে মারে। ঘটনাটি দিনহাটার মদনমোহন পাড়া এলাকায় ঘটেছে। অন্য দিকে, ফল ঘোষণার পরে তুফানগঞ্জের বলরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বলরামপুর বাজারে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে স্থানীয়দের জনরোষ আছড়ে পড়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে দলীয় কার্যালয়।

একই পরিস্থিতি সামনে এসেছে উত্তর ২৪ পরগনার মিনাখাঁয়। নির্বাচনে এই বিধানসভা থেকে জয় লাভ করছে তৃণমূল। এই কেন্দ্রেও বামনপুকুর এলাকায় অশান্তির ঘটনা সামনে এসেছে। স্থানীয়রা পঞ্চায়েত সমিতির সদস্য মহুয়া সর্দার মাইতির বাড়িতে ব্যাপক ভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মহুয়া সর্দার মাইতি এলাকায় দোকানদারদের কাছ থেকে তোলা তুলত। স্থানীয়দের আরও দাবি, মহুয়ার দলবলের অত্যাচারে তাঁরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। যদিও তৃণমূলের অভিযোগ, স্থানীয়েরা নাকি পঞ্চায়েত লুটপাট করেছে। তাঁর পরিবারের মহিলাদের মারধর করেছে। 

সোমবার ফল ঘোষণার পর বাঁকুড়ায় তৃণমূলের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালায় এলাকাবাসীরা। তার পরে অফিসে থাকা কাগজপত্র জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। ওই জেলায় বিজেপি-তৃণমূলের সংঘর্ষে ঘটনা ঘটেছে। দু’জন জখম হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন বিজেপি কর্মী। আহতেরা আপাতত হাসপাতালে ভর্তি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীও মোতায়েন করা হয়েছে৷

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বীরভূমের নানুরের সন্তোষপুরে দুপুর থেকে বিজেপি-তৃণমূল সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। অভিযোগ, হাতে দা-কাটারি-কোদাল নিয়ে দুই গোষ্ঠীর সংঘর্ষ ঘটেছে। দু’পক্ষের মধ্যে বোমাবাজিও হয়েছে। বিজেপির দাবি, তাদের ওপরে প্রথম হামলা করেছে তৃণমূল।

কলকাতায় রুবিতে তৃণমূলের দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে। ঘটনায় পুলিশ মামলা দায়ের করেছে। অন‍্য দিকে, ১০০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূলের কার্যালয় ভাঙচুর করে দিয়েছে স্থানীয়েরা। ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূলের সভাপতিকে ধরে স্থানীয়েরা মারধর করেছে। যদিও এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত থানায় কোনও অভিযোগ দায়ের করেনি বলেই লালবাজার সূত্রে জানা গিয়েছে।

দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড়ের নিমকুড়িয়া গ্রামে তৃণমূল কর্মীর বাড়িতে ঢুকে হামলা চালানো হয়েছে। সেখানে আইএসএফের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূল কর্মী দাবি, তিনি তৃণমূল করেন বলে আইএসএফের বুথের সভাপতির নেতৃত্বে ৫০-৬০ জন তাঁর বাড়িতে ঢুকে তাঁকে বেধড়ক মারধর করে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কোপানোর অভিযোগ উঠেছে। জখম তৃণমূল কর্মী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। 

কলকাতার পাশ্ববর্তী জেলা হাওড়ায় ফলাফল স্পষ্ট হওয়ার পরে বালির তৃণমূল নেতা কৈলাশ মিশ্রের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর চালান স্থানীয়েরা। ঘটনায় এক স্থানীয় ব‍্যবসায়ী বলেন, “তোলার টাকা দিতে দিতে আমরা হাঁপিয়ে গিয়েছি। না দিলেই কৈলাশের দলবল এসে ব‍্যবসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিত।” হাওড়ার তৃণমূল নেতা শ‍্যামল মিত্রকেও স্থানীয়েরা মারধর করেছে। 

এ দিকে বিজেপির জয়ের পরেই আসানসোল জুড়ে হিংসা ছড়িয়েছে। সেখানকার তৃণমূলের জেলা দফতরে হামলা চালানো হল। ব্যপক ভাবে ভাঙচুর চালানো হয়েছে তৃণমূলের জেলা সদর দফতরে। শুধু তাই নয় অগ্নি সংযোগ করে নথিপত্র পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানাচ্ছেন, তৃণমূলের বেশ কিছু বিক্ষুব্ধ কর্মী দফাই দফায় এই অশান্তি ছড়িয়েছেন।।

হুগলিতেও একই ছবি ধরা পড়েছে। হুগলির কাপাসডাঙা এবং রবীন্দ্র নগরে তৃণমূলের কার্যালয়ে জনরোষ আছড়ে পড়েছে। তৃণমূলের দাবি, সেখানে বিজেপির কর্মীরা ভাঙচুর করে দলীয় কার্যালয় দখল করে নিয়েছে। যদিও সেখানকার স্থানীয় বিজেপি নেতার উদ্যোগ নিয়ে দলীয় কার্যালয় ফিরিয়ে দিয়েছেন।

এদিকে, পরাজয়ের পরেও তৃণমূলের হিংসাত্মক কার্যকলাপ অব্যাহত। হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরের বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটেছে। তিনি বিজেপি জেতার আনন্দে আবির খেলছিলেন, তাই তাঁকে পিটিয়ে হত‍্যা করেছে তৃণমূল আশ্রিত দুষ্কৃতীরা— মৃতের পরিবার এমনই অভিযোগ করেছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিউ টাউনের বিজেপির বিজয় মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেখানে মধু মন্ডল নামে এক বিজেপি কর্মীকে রাস্তায় ফেলে পিটিয়ে খুন করা হয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। ঘটনায় এখনও পর্যন্ত আট জনকে গ্রেফতার করেছে। 

একদিকে যখন জনরোষের মুখে পড়ছে তৃণমূল। অপর দিকে নাটকীয় মোড় নিয়েছে রাজ্য-রাজনীতি। খোদ বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুর থেকে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত। তার পরেও হার স্বীকার করতে নারাজ তিনি। এখনও পর্যন্ত রাজ্যপালের পদত্যাগ পত্র তিনি দেননি। মমতার দাবি, তিনি ইস্তফা দেবেন না। তৃণমূলকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী ৯ মে রাজ্যে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী শপথ গ্রহণ করতে পারে বলে সূত্রের খবর। নতুন সরকার গঠনের পর রাজ্য-রাজনীতি কি নতুন মোড় নয় তাই এখন দেখার।


Share