Election Commission

দু’হাজার কোটির দোরগোড়ায় বাংলার ভোট খরচ, দু’বছরে ব্যয় বৃদ্ধি প্রায় ২৫ শতাংশ

নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভা নির্বাচনের ব্যয়ের ৩০ শতাংশ বহন করে কেন্দ্র এবং ৭০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার। অর্থাৎ, মোট ব্যয় যদি দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছয়, তবে প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দায় পড়বে রাজ্য সরকারের ওপর।

নির্বাচন কমিশন
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০২৬ ০৩:৪২

দু’বছরের ব্যবধানে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন পরিচালনার ব্যয় প্রায় ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রাথমিক হিসাব অন্তত সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে। ভোটার তালিকা বিশেষ নিবিড় সংশোধন শেষ হওয়ার পর এ বারের বিধানসভা ভোটে মোট খরচ প্রাথমিকভাবে দুই হাজার কোটির কাছাকাছি পৌঁছতে পারে বলে রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে। যদিও আনুষ্ঠানিক ভোটসূচি ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন, প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল গত অক্টোবরেই, এসআইআর প্রক্রিয়া ঘোষণার পর থেকে। সেই অতিরিক্ত প্রস্তুতি-পর্বই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব কোনও আয়ের উৎস নেই। নিয়ম অনুযায়ী, বিধানসভা নির্বাচনের ব্যয়ের ৩০ শতাংশ বহন করে কেন্দ্র এবং ৭০ শতাংশ সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকার। অর্থাৎ, মোট ব্যয় যদি দুই হাজার কোটি টাকায় পৌঁছয়, তবে প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকার দায় পড়বে রাজ্য সরকারের ওপর। কমিশন সূত্রের দাবি, এটি এখনও পরিকল্পনাভিত্তিক প্রাথমিক হিসাব; বাস্তবে খরচ আরও বাড়তে পারে।

২০২১ সালে কোভিড পরিস্থিতির মধ্যে হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল এক হাজার কোটির সামান্য বেশি। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেই অঙ্ক বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক হাজার ৬০০ কোটিতে। সেই তুলনায় এ বারের নির্বাচনী ব্যয় আরও প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এসআইআর-এর পর ভোটার সংখ্যা কমেছে। ২০২৫ সালের তালিকায় যেখানে ভোটার ছিলেন সাত কোটি ৬৬ লক্ষ, চূড়ান্ত তালিকায় তা নেমে এসেছে প্রায় ছ'কোটি ৪৪ লক্ষে। যদিও ‘আন্ডার অ্যাজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন তালিকাভুক্ত ভোটারদের একটি অংশ পরবর্তী সম্পূরক তালিকায় যুক্ত হয়ে ভোটাধিকার পেতে পারেন।

নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতি বুথে ভোটারের গড় সংখ্যা এক হাজার ৫০০ থেকে কমিয়ে এক হাজার ২০০ করা হয়েছে। ফলে বুথের সংখ্যা ৮০ হাজার ৬৮১ থেকে সামান্য বেড়ে ৮০ হাজার ৭১৯ হয়েছে। পাশাপাশি ভোটার সহায়তায় প্রতিটি বুথে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে, যাঁরা বুথ লেভেল অফিসারদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবেন।

পর্যবেক্ষক নিয়োগেও এ বার ব্যতিক্রমী বিস্তার দেখা যাচ্ছে। ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রে একজন করে সাধারণ পর্যবেক্ষক, গড়ে চারটি কেন্দ্র পিছু একজন পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং ১০০ জন ব্যয়-পর্যবেক্ষক মিলিয়ে মোট ৪৭৮ জন পর্যবেক্ষক বাংলায় মোতায়েন করা হচ্ছে। এঁরা চলতি মাসের মধ্যেই রাজ্যে পৌঁছবেন। এর পাশাপাশি পরে নিয়োগ করা হবে মাইক্রো অবজ়ার্ভারও। দু’দফার ভোট পরিচালনার জন্য প্রায় আড়াই হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনী আনার প্রস্তুতি চলছে, যাদের আবাসন, যাতায়াত ও লজিস্টিক ব্যবস্থাপনাতেই বড় অঙ্কের ব্যয় হবে।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভিনরাজ্য থেকে আসা পর্যবেক্ষকদের আবাসন ও আনুষঙ্গিক ব্যবস্থাপনা সামলাতে জেলা প্রশাসনের ওপরও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। নির্বাচন-সংক্রান্ত অতিরিক্ত দাবি-দাওয়ার মধ্যে কখনও ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী, কখনও অফিস কক্ষের সরঞ্জাম পর্যন্ত অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।

এসআইআর প্রক্রিয়ার জন্য আলাদা করে ৪৫০ কোটি টাকার বাজেট ধরা হয়েছিল, যা ইতিমধ্যেই ৫০০ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। ‘অ্যাজুডিকেশন’ তালিকাভুক্ত ভোটারদের নথি যাচাই করতে ব্যতিক্রমীভাবে ৭০০ জন বিচারক নিয়োগ করা হয়েছে, প্রত্যেককে এক লক্ষ টাকা সম্মানী দেওয়ায় শুধু এই খাতেই ব্যয় হচ্ছে ৭ কোটি টাকা। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও বিচারকদের নিয়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তুতিও চলছে, যার ব্যয় এখনও নির্ধারিত হয়নি।

এসআইআর-এ তদারকির জন্য দু’জন প্রাক্তন আমলা-সহ ২৬ জন রোল পর্যবেক্ষক, আট হাজার মাইক্রো অবজ়ার্ভার এবং কেন্দ্রীয় কর্মীদেরও কাজে লাগানো হয়েছে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর দু’মাসের জন্য মাসিক চার হাজার টাকা ভাড়ায় ৮ হাজার ল্যাপটপ নিয়েছে। সব মিলিয়ে নির্বাচনী প্রক্রিয়া যত এগোচ্ছে, ব্যয়ের তালিকাও তত দীর্ঘ হচ্ছে। 


Share