Eviction of Mosque

সিপিএম এবং তৃণমূল জমানায় অটুট, বিমানবন্দরের জায়গা দখল করে মসজিদ, সরানো নিয়ে জেলাশাসকের দফতরে বৈঠক

পালাবদল হয়েছে। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, এ বার সমস্যার সমাধান হতে পারে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার ভিতরে মসজিদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সেটি স্থানান্তরের পক্ষে মত দিয়েছেন।

বিমানবন্দরের জায়গা দখল করে অবস্থান করছে মসজিদ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৩ মে ২০২৬ ১১:৫২

বিমানবন্দরের জায়গা দখল করে মসজিদ নিয়ে একাধিক বার রাজ‍্য সরকারকে বলেছিল কলকাতা বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। ‘সদিচ্ছা’র অভাবে তা হয়ে ওঠেনি। রাজ‍্যে বিজেপি সরকার গঠন করেছে। এ বার পালাবদলের পরে কলকাতা বিমানবন্দরের বিকল্প রানওয়ের পাশে থাকা মসজিদটি সরানো নিয়ে নতুন করে তৎপরতা শুরু হয়েছে। 

মঙ্গলবার জেলার প্রশাসনিক কর্তারা এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের আধিকারিকরা মসজিদটি পরিদর্শন করেন। এরপর বুধবার উত্তর ২৪ পরগনার জেলাশাসকের দফতরে রাজ্য প্রশাসন ও মসজিদ কমিটির প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সূত্রের খবর, সেখানে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা, সুরক্ষা এবং বিমান চলাচলের স্বার্থে মসজিদটি স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে।

দাবি, গৌরীপুর জামা মসজিদ ১৩৬ বছরের পুরনো। ‘বাঁকড়া মসজিদ’ নামেও পরিচিত এটি। এক সময় এখানে বিস্তীর্ণ ফাঁকা জমি ছিল। তা দখল করে এই মসজিদ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। জনস্বার্থে কলকাতা বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ হয়েছে। ফলে বর্তমানে এই মসজিদটি কলকাতা বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার অনেকটাই ভিতরে চলে এসেছে। জানা গিয়েছে, মসজিদটি বিকল্প রানওয়ের উত্তর দিকে মাত্র ১৬৫ মিটার দূরে এবং সরকারি সীমানা প্রাচীরের প্রায় ১৫০ মিটার ভিতরে অবস্থান করছে। বিমান চলাচল সংক্রান্ত নিয়ম অনুযায়ী রানওয়ে থেকে যেকোনও স্থাপনার ন্যূনতম দূরত্ব হওয়া উচিত ২৪০ মিটার। এ ক্ষেত্রে তা কোনটাই মানা হয়নি। 

বুধবারের বৈঠকে বিমানবন্দর আধিকারিকরা জানান, মসজিদটির অবস্থানের কারণে বিকল্প রানওয়ের টাচডাউন পয়েন্ট ৮৮ মিটার দক্ষিণ দিকে সরাতে হয়েছে। ফলে বর্তমানে রানওয়ের কার্যকর দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে দু’হাজার ৮৩২ মিটার। এর ফলে এয়ারবাস এ৩২০ বা বোয়িং ৭৩৭-এর মতো সরু দেহের বিমান ওঠানামার জন্য যথেষ্ট হলেও বোয়িং ৭৮৭ বা এয়ারবাস এ৩৩০-এর মতো বৃহৎ বিমানের জন্য উপযুক্ত নয়। পাশাপাশি জরুরি অবতরণের সময়ও এটি নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও জানিয়েছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

বিমানবন্দরের অধিকর্তা বিক্রম সিংহ বলেন, “বিমানবন্দরের ভিতরে এই মসজিদের উপস্থিতি একটা বহুদিনের সমস্যা। এর ফলে বিমান চলাচলে নানা অসুবিধা তৈরি হয়েছে। বুধবার আবার আলোচনা হয়েছে। আমরা ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশায় রয়েছি।” বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের দিনে যখন মূল রানওয়ে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না, তখন এই বিকল্প রানওয়ে কার্যকর রাখতে আধুনিক প্রযুক্তি বসানোর প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু মসজিদের উপস্থিতির কারণে সেখানে সেই পরিকাঠামো স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।

মসজিদ কমিটির প্রতিনিধি ও প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরির নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল প্রশাসনকে জানিয়েছে, এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাদের নেই। বিষয়টি নিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ, অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল’ বোর্ড এবং জামিয়ত উলেমা-ই-হিন্দের সঙ্গে আলোচনা করার জন‍্য দাবি করা হয়েছে।

মসজিদ কমিটির সদস্য আবুল কালামের দাবি, ওই মসজিদে শুধুমাত্র বাঁকড়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারাই এখানে নামাজ পড়তে আসে। বাইরে থেকে কাউকে অনুমতি দেওয়া হয় না। বলেন, “আমরা সবসময় প্রশাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেছি। তল্লাশি বা পরিচয়পত্র দেখাতে কখনও আপত্তি করিনি। কিন্তু মসজিদ সরানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া আমাদের এক্তিয়ারের বাইরে।”

বর্তমানে প্রতিদিন পাঁচবারের নমাজে প্রায় ১০ থেকে ২৫ জন অংশ নেয়। শুক্রবার জুম্মা নমাজে সেই সংখ্যা প্রায় ৮০-তে পৌঁছোয়। বিমানবন্দরের সীমানার ভিতরে জায়গা সংরক্ষিত এবং সংবেদনশীল। এলাকায় প্রবেশের আগে সিআইএসএফের জওয়ানেরা তল্লাশি করে। তারপরে যাত্রীদের বাসে করে মসজিদে নিয়ে যায়। নমাজের শেষে ফের ফিরিয়ে আনা হয়। সরকারি সময় এবং ব‍্যবস্থাপনা ধর্মীয় কাজে কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিয়ে এ কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন। 

এর আগে সিপিএমের জমানায় জ্যোতি বসু থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সময় এই মসজিদ স্থানান্তর নিয়ে কেউই সদিচ্ছা দেখায়নি। তারপরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায়ও একই ছবি উঠে এসেছে। সিপিএম বা তৃণমূলের জমানায় মসজিদ সরানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কোনও ভাবেই তা সফল হয়নি।

গত বছরের জুন মাসে ওই বিমানবন্দরের ভিতরে থাকা মসজিদ সরানোর দাবিতে কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সে দিন তিনি বলেছিলেন, “কেন্দ্রীয় সরকার এত টাকা দিচ্ছে, তার পরেও কেন বিমানবন্দরের সুরক্ষায় ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এখানে যদি এই মসজিদ সরাতে না পারেন, তাহলে এত টাকা খরচ করে রানওয়ে বানানোর কী দরকার আছে।” এর পরেই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, “এই মসজিদ এখান থেকে সরাতেই হবে। না হলে বিধায়কদের নিয়ে দফতরের সামনে বসে থাকব।”

পালাবদল হয়েছে। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার রয়েছে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী, এ বার সমস্যার সমাধান হতে পারে। সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিমানবন্দরের অপারেশনাল এলাকার ভিতরে মসজিদের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সেটি স্থানান্তরের পক্ষে মত দিয়েছেন।


Share