Annapurna Protest

অন্নপূর্ণা-বিক্ষোভ থামাতে হিমশিম পুলিশের, উত্তপ্ত উত্তর থেকে দক্ষিণ, ক্ষোভ প্রশমনে ব্যর্থ রাজ্য সরকার, উত্তর খুঁজছেন মহিলারা

বাদ যায়নি কলকাতাও। শুক্রবার দুপুরে ফুলবাগানে প্রায় দেড়শো জন মহিলা রাস্তা আটকে পুরসভার বোরো অফিসের বিক্ষোভ দেখানো হয়। পরে ফুলবাগান থানার পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২২ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩৩

অন্নপূর্ণা-বিক্ষোভ অব্যাহত। ২০ অগস্ট কেটে গেলেও অনেকেই টাকা পাননি। এমন নয় যাঁরা টাকা পাননি তাঁরা আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল। তা নিয়ে ক্ষোভ আছড়ে পড়েছে রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রান্তে। 

শুরু হয়েছিল আরামবাগ থেকে। বৃহস্পতিবার আরামবাগে মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টার নামার পরেই কয়েক জন মহিলা অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে বিক্ষোভ দেখায়। তাঁদের অভিযোগ, তাঁরা ঠিকমতো ফর্ম পূরণ করে জমা দিয়েছিল। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে অ‍্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। যে আবেদন তাঁরা করেছেন তা এখনও ‘প্রসেসিং’ দেখাচ্ছে। 

আবার ওই দিনই, মধ‍্যমগ্রামেও বিক্ষোভ হয়। সেখানেও কার্যত একই অবস্থা। টাকা না পেয়ে পুরসভার ঢুকে ভাঙচুর চালানো হয়। উত্তরবঙ্গের বালুরঘাটের মহকুমাশাসকের কার্যালয়ের একটি দিক তো বিক্ষোভের জেরে বন্ধই করে দিতে হয়। অভিযোগ ছিল, ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে লাইনে তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু টাকা কেন এল না দফতরের কেউ তার কোনও সদুত্তর দিতে পারেনি। ধূপগুড়িতেও রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান এলাকার মহিলারা।

বৃহস্পতিবারের বিক্ষোভ থামলেও বিক্ষোভের আগুন শুক্রবার আরও বেশি ছড়িয়েছে। শুক্রবার মেদিনীপুরের প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে এসেছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। মহকুমাশাসকের দফতরে ঢোকার আগে একপ্রস্ত বিক্ষোভের মুখে পড়েন। মহিলাদের চেঁচামেচি আর বিক্ষোভের মাঝে বৈঠক ছেড়ে বেরিয়ে আসতে বাধ্য হন রাজ্যের মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা। তাঁর সাফাই, রাজ্যে সরকার গঠন হয়েছে মাত্র ১০০ দিন হয়েছে। একটি সময়ের দরকার। তা শুনেই আরও বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে তাঁদের সঙ্গে কথা বলে সভাস্থল ছেড়ে চলে যান।

বেশি ভাগ মহিলাদেরই অভিযোগ তাঁরা আর্থিক ভাবে দুর্বল। কারও রাস্তায় দোকান রয়েছে, আবার কেউ সব্জি বিক্রি করে সংসার চালান। এমন মহিলারাও বাদ পড়েছেন। কেন বাদ পড়েছেন তা তাঁরা জানতে পারছেন না। অভিযোগ তাঁদের জানানো হচ্ছে না। এক সব্জি বিক্রেতা মহিলার দাবি, তাঁদের পরিবারের ১০ জন সদস্য রয়েছে। দশজন সদস্য একটি ঘরে থাকেন না। বাড়ি রয়েছে। সেই মতো সবার ঘরও রয়েছে। বক্তব্য, বাড়ি রয়েছে বলে যে আর্থিক অবস্থা ভালো হবে তার মাপকাঠি কীভাবে ঠিক হল। বুঝতেই পারছেন না তাঁরা।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অন্নপূর্ণা যোজনা এ ভাবে চালু করে দেওয়া ঠিক হয়নি। সময় নিয়ে সমস্ত দিক বিবেচনা করা উচিত ছিল। বিস্তারিত সমীক্ষার প্রয়োজন ছিল। যোগ‍্যরা তো পাবেনই। তার সঙ্গে এই ভুয়ো উপভোক্তাদেরও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্ভব হত। গোটাটাই পরিকল্পনার ওপরে নির্ভরশীল। তা হলে এ ভাবে রাজ‍্য জুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি হত না। তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আঁচ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তারাও কি বুঝতে পারেননি? এমন প্রশ্নও উঠছে। অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও তা খতিয়ে দেখতে হবে সরকারকেই। যদি গাফিলতি থেকে থাকে তা কীভাবে হয়েছে রাজ‍্যকেই দেখতে হবে। উপভোক্তারা যাতে পরিষেবা পায় তা নিশ্চিত সরকারকেই করতে হবে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

বৃহস্পতিবারের পরে শুক্রবার দিনভর গোটা রাজ্যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটিতে অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে রেললাইন অবরোধ করেন কয়েকশো মহিলা। দুপুরে বিরাটি স্টেশনের শেষ প্রান্তে তাঁরা ফ্লাইওভারের নীচে জমায়েত হন। তারপরে রেললাইনে বসে পড়েন। ফলে হাসনাবাদ-শিয়ালদহ ডাউন লোকাল দুপুর ১টা ৩৫ মিনিট নাগাদ বিরাটি স্টেশনে ঢোকার পর দাঁড়িয়ে যায়। এরপর একাধিক লোকাল বিভিন্ন স্টেশনে আটকে পড়ে। এক ঘণ্টারও বেশি সময় ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়। ফলত যাত্রীদের সমস্যায় পড়তে হয়। বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে যাত্রীদের বচসাও হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছোয়।

বিক্ষোভকারী মহিলাদের দাবি, অন্নপূর্ণা ভান্ডারের জন্য প্রয়োজনীয় নথি জমা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি একাধিকবার তথ্য যাচাইও হয়েছে। আবেদন অনুমোদিত দেখালেও তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢোকেনি। অথচ অন্য অনেক উপভোক্তা টাকা পেয়ে গিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় ২০ তারিখের মধ্যে টাকা পৌঁছনোর কথা ছিল। সেই সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও টাকা না মেলায় ক্ষোভ আরও বেড়েছে। যোগ্য প্রত্যেক উপভোক্তাকে তাঁরা টাকা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিরাটির পাশাপাশি হাবড়াতেও একই ইস্যুতে বিক্ষোভ দেখা যায়। রেললাইন অবরোধের পাশাপাশি হাবড়া পুরসভার সামনেও মহিলারা জড়ো হন। তাঁদের কটাক্ষ, অন্নপূর্ণা যোজনার নাম বদলে ‘ঢুকেছে কি ঢোকেনি’ রাখা উচিত। তাঁদের অভিযোগ, সাইবার ক্যাফেতে ফর্ম পূরণ, পুরসভা ও বিভিন্ন দফতরে নথি জমা এবং বাড়িতে গিয়ে তথ্য যাচাই— সব প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরেও টাকা মেলেনি। পুরসভায় এসে টাকা না পাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সেখানেও সমস্যার সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ। যোগ্যদের একসঙ্গে টাকা দেওয়ার পাশাপাশি যাঁদের তথ্য যাচাই বাকি রয়েছে, দ্রুত সেই প্রক্রিয়া শেষ করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

একই অভিযোগে তারকেশ্বর পুরসভার সামনে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখালেন কয়েকশো মহিলা। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে আসে তারকেশ্বর থানার পুলিশ। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ১০ জুলাই পর্যন্ত আবেদনকারীদের ১৭ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে টাকা পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনেকেই টাকা পাননি। টাকা না পাওয়ার কারণ জানতে পুরসভায় এসে কোনও সদুত্তর মেলেনি। ফলত বিক্ষোভ শুরু হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে বিক্ষোভ চলার পর পুর প্রতিনিধি ও পুলিশের আশ্বাসে তা প্রত্যাহার করেন মহিলারা। এই একই দাবিতে গোঘাট-২ বিডিও অফিসেরও মহিলারা বিক্ষোভ দেখান। শুক্রবার সকালে উত্তরপাড়া-কোতরং পুরসভারতেও বিক্ষোভ চলে। টাকা না পেয়ে ২০ মিনিট জিটি রোড অবরোধ করা হয়। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

পাশাপাশি, ভোটের আগে বিজেপির তরফে বাড়ি বাড়ি প্রচারে গিয়ে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন তোলেন। আবার চণ্ডীতলা-২ বিডিও অফিসেও অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা না পাওয়ার অভিযোগে মহিলারা বিক্ষোভে সামিল হন। আবার চুঁচুড়ার বিধায়ক সুবীর নাগের কার্যালয়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। বিধায়কের আশ্বাসের পরে বিক্ষোভ উঠে যায়।

এ দিন অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা না পেয়ে নদিয়ার করিমপুর-২ ব্লকে অফিসে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে। কর্মীদের মারধর করা হয়েছে বলেও অভিযোগ ওঠে। নদিয়ার আরেক প্রান্ত, কল‍্যাণী পুরসভাতেও এই প্রকল্পের টাকা না পেয়ে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় মহিলারা।

বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরেও শুক্রবার বিক্ষোভের ছবি দেখা যায়। অন্নপূর্ণার টাকা না পাওয়ার অভিযোগে মহকুমাশাসকের দফতরের সামনে জড়ো হন মহিলারা। পরে রাস্তা অবরোধও করা হয়। খবর পেয়ে বিষ্ণুপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়। বিক্ষোভকারীদের হুঁশিয়ারি, দ্রুত টাকা না মিললে আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনে নামবেন তাঁরা। একই দিনে বড়জোড়া বিডিও অফিসেও বিক্ষোভ দেখান কয়েক জন মহিলা। তাঁদের বিক্ষোভের জেরে বাঁকুড়া-দুর্গাপুর রাজ্য সড়কেও যান চলাচল ব্যাহত হয়।

উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ারেও অন্নপূর্ণার টাকা নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়েছে। ধূপগুড়িতে প্রায় ২০০ মহিলা জাতীয় সড়ক অবরোধ করেন। প্রথমে ধূপগুড়ি থেকে ফালাকাটাগামী ৩১ নম্বর জাতীয় সড়কে বসে পড়েন তাঁরা। পাশাপাশি বিডিও অফিসেও বিক্ষোভ দেখানো হয়। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ভোটের আগে বিজেপির তরফে লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদের ৩ হাজার টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে তাঁদের নানা শর্তের মধ্যে পড়তে হচ্ছে এবং যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও অনেকেই টাকা পাচ্ছেন না। অবরোধ তুলতে গেলে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ধস্তাধস্তির পরিস্থিতিও তৈরি হয়।

অন্নপূর্ণা ভান্ডারের টাকা নিয়ে একাধিক জেলায় পরপর এই বিক্ষোভ ঘিরে এখন প্রশাসনের উপর চাপ বাড়ছে। উপভোক্তাদের একটাই দাবি—যাঁরা যোগ্য, তাঁদের দ্রুত টাকা দিতে হবে। নথি যাচাইয়ের নামে হয়রানি বন্ধ করতে হবে।

বাদ যায়নি কলকাতাও। শুক্রবার দুপুরে ফুলবাগানে প্রায় দেড়শো জন মহিলা রাস্তা আটকে পুরসভার বোরো অফিসের বিক্ষোভ দেখানো হয়। পরে ফুলবাগান থানার পুলিশ সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

এমন বিক্ষোভ ঠেকাতে পুলিশকে হিমশিম খেতে হয়। কোথাও উচ্চপদস্থ পুলিশ আধিকারিক বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বললেও তা বিফলে যায়। কোথাও মৃদু বল প্রয়োগ করতে হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, এটা তাড়াহুড়োর করার ফল। পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। তাই গোটা রাজ‍্যে এ ভাবে একটা অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এটা একেবারেই অনভিপ্রেত। সরকারের চিন্তাভাবনা করা উচিত।


Share