Arrest TMC Leader

নতুন সিম, ওড়িশায় গা-ঢাকা! টাওয়ার লোকেশন ধরে পুরীর হোটেল থেকে পাকড়াও আরজি কর-কাণ্ডের অভিযুক্ত নির্মল ঘোষ

এই ঘটনায় সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ থানায় মৃত চিকিৎসক-ছাত্রীর বাবা এফআইআর দায়ের করেন। সেই এফআইআরের ভিত্তিতেই নির্মলকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

গ্রেফতার নির্মল ঘোষ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২৬ ০১:৪৪

ওড়িশা থেকে গ্রেফতার করা হল পানিহাটির প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষকে। আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় নির্যাতিতার দেহ জোর করে সৎকার করার অভিযোগ উঠেছিল নির্মল ঘোষ-সহ তিন জনের বিরুদ্ধে। এই ঘটনায় সোমবার উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহ থানায় মৃত চিকিৎসক-ছাত্রীর বাবা এফআইআর দায়ের করেন। সেই এফআইআরের ভিত্তিতেই নির্মলকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে খবর।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এফআইআর দায়েরের পরই নির্মল পড়শি রাজ্য ওড়িশায় গা-ঢাকা দিয়েছিলেন। পুলিশের নজর এড়াতে নতুন সিমকার্ড ব্যবহার করছিলেন। সেই নম্বর থেকেই তিনি ঘনিষ্ঠ কয়েক জনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। গত মঙ্গলবার মোবাইলের টাওয়ার লোকেশন ধরে পুলিশ তাঁর গতিবিধির হদিস পায়। সেই সূত্রেই বৃহস্পতিবার সকাল ন'টা নাগাদ পুরীর কাছে একটি হোটেলে পুলিশ হানা দেয়। সেখান থেকেই নির্মলকে গ্রেফতার করা হয়।

প্রাথমিক ভাবে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার ওড়িশার একটি আদালতে নির্মল ঘোষকে হাজির করানো হবে। আদালতের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর রাতের মধ্যেই ট্রানজিট রিমান্ডে তাঁকে কলকাতায় আনা হতে পারে। শুক্রবার তাঁকে ব্যারাকপুর আদালতে হাজির করানোর সম্ভাবনা রয়েছে। নির্মলের গ্রেফতারি প্রসঙ্গে রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায় বলেন, “এটা আগেই হওয়া উচিত ছিল।”

রবিবার ছিল আরজি কর-কাণ্ডে নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ওই দিন উত্তর ২৪ পরগনার পানিহাটিতে আয়োজিত স্মরণসভায় মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী উপস্থিত ছিলেন। পানিহাটির শ্মশানঘাটে সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল, তা খতিয়ে দেখতে তিনি ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটকে নির্দেশ দেন। এরপরই সোমবার পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষ, মৃতার এলাকার পুরপ্রতিনিধি সোমনাথ দে এবং প্রতিবেশী সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়।

তরুণী চিকিৎসকের পরিবারের অভিযোগ, ঘোলা থানার নাটাগড় কদমতলা শ্মশানঘাটে শেষকৃত্যের সময় স্থানীয় প্রশাসন তাড়াহুড়ো করেছিল। নির্মল ঘোষ-সহ তিন জন কেন দেহ সৎকারের বিষয়ে এতটা সক্রিয় হয়ে উঠেছিলেন, তা নিয়েও মৃতার বাবা-মা প্রশ্ন তোলেন। এমনকি শ্মশানে দাহকার্যের নির্ধারিত খরচও মকুব করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। রবিবার মুখ্যমন্ত্রী জানান, দাহ প্রক্রিয়ায় বেআইনি কাজ করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, সে দিন শ্মশানঘাটে লাইনে তৃতীয় দেহটি ছিল আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের। কিন্তু অন্য দেহগুলিকে টপকে তড়িঘড়ি তাঁর সৎকার করা হয় বলে অভিযোগ। পরিবারের তরফেও শ্মশানের নির্ধারিত খরচ দেওয়া হয়নি বলে জানা গিয়েছে। এই গোটা ঘটনার নেপথ্যে প্রভাবশালী যোগ থাকার সন্দেহ প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দে এবং সঞ্জীব মুখোপাধ্যায় মিলে এই পুরো কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন।”

নির্যাতিতার বাবার দায়ের করা নতুন অভিযোগেও দ্রুত দেহ সৎকারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট নিহত চিকিৎসক-ছাত্রীর দেহ তড়িঘড়ি দাহ করে দেওয়া হয়। ময়নাতদন্তের পর পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়ার পরেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো হয়েছিল বলে অভিযোগ। মৃতার বাবার দাবি, অভিযুক্ত তিন জন কয়েক জন দলীয় কর্মীকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের বাড়িতে গিয়ে দ্রুত দেহ শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। ফলে পরিবারের অনেকেই শেষ শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পাননি। খড়দহ থানায় অভিযোগ দায়ের হওয়ার পরই পুলিশ বিষয়টি নিয়ে তদন্তে নামে।

এ দিকে নির্মল ঘোষ এবং তাঁর ছেলে, এ বারের পানিহাটি বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী তীর্থঙ্কর ঘোষের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। তোলাবাজি, বেআইনি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন এবং লটারির টিকিট হাতিয়ে নেওয়ার মতো অভিযোগে গত ১৩ জুলাই দক্ষিণেশ্বর থেকে তীর্থঙ্করকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে এরপর থেকে নির্মলকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি। জুলাই মাসে তৃণমূলের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের একটি বৈঠকে অবশ্য তাঁকে দেখা গিয়েছিল।

ঋতব্রত শিবিরের তরফে সে সময় জানানো হয়েছিল, নির্মল ঘোষকে ওই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তিনি নিজেই সেখানে এসেছিলেন এবং বৈঠকের শেষ দিকে ঢুকেছিলেন। ঋতব্রত শিবিরের বিধায়ক সন্দীপন সাহা বলেছিলেন, “আমরা বেনোজল আটকাতে বদ্ধপরিকর। বেনোজল আটকাতে ছাঁকনি রাখা হচ্ছে।’’ যদিও নির্মলের দাবি ছিল, তিনি বৈঠকে যোগ দিতে যাননি। কসবার বিধায়ক জাভেদ খানের সঙ্গে দেখা করতেই সেখানে গিয়েছিলেন।

পানিহাটির তিন বারের বিধায়ক নির্মল স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ‘নান্টু’ নামে পরিচিত। ২০১১, ২০১৬ এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পর পর তিন বার তৃণমূলের টিকিটে পানিহাটি থেকে তিনি জয়ী হন। তবে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী করেনি দল। তাঁর বদলে পানিহাটিতে তৃণমূল প্রার্থী করে তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে। কিন্তু বিজেপি প্রার্থী তথা আরজি করের নিহত চিকিৎসকের মায়ের কাছে পরাজিত হন তীর্থঙ্কর।


Share