Job Scam

পুরনিয়োগে মাথাপিছু ছ’লক্ষ! ৩০০ জনের বেশি চাকরি প্রার্থীকে সুপারিশ করেছেন সুজিত বসু, হাই কোর্টে বিস্ফোরক ইডি

ইডি আরও দাবি করে, নিয়োগ দুর্নীতি মামলার অভিযুক্ত অয়ন শীলকে জেরা করা হয়েছে। তা থেকে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে, সুজিত বসু অযোগ‍্য প্রার্থীদের সুপারিশ করতেন। এ ছাড়াও, চাকরি পাইয়ে দিতে অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশও সুজিত পুরসভায় পাঠাতেন।

প্রাক্তন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১২ আগস্ট ২০২৬ ১০:৩৬

ছ’লক্ষ দিলেই পুরসভায় চাকরি পাওয়া যাবে। এ ভাবেই চাকরি কার্যত বিক্রি করেছেন রাজ্যের প্রাক্তন দমকল মন্ত্রী সুজিত বসু। বুধবার আদালতে জামিনের মামলার শুনানি হয়েছে। সেই মামলার শুনানিতে এমনই অভিযোগ করেছে ইডির আইনজীবী এসভি রাজু। এসভি রাজু জানিয়েছেন, বিপুল সংখ্যক পুরসভার চাকরি বেআইনি ভাবে বিক্রি করেছেন। তার বিনিময়ে বিপুল আর্থিক লেনদেন করেছেন। ‘দুর্নীতির পাহাড়’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি। আগামী ১৯ অগস্ট এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। 

পুরসভায় নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় গত ১১ মে রাজ‍্যের প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুকে ইডি দফতরে তলব করা হয়েছিল। টানা সাড়ে ১০ ঘন্টা জেরার পরে ইডি তাঁকে হেফাজতে নেয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি পুরসভায় অযোগ‍্য প্রার্থীদের চাকরি পাইয়ে দিতেন। তার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। মূলত, করোনার সময়ে যখন চারিদিকে হাহাকার সেই সময় সুজিত বসু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের অ‍্যাকাউন্টে কোটি কোটি টাকা ঢুকেছে। সুজিতের ছেলের রেস্তোরাঁর অ‍্যাকাউন্টে ওই সময় কয়েক কোটি টাকা ঢুকেছে। পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী এবং পরিবারের সদস্যদের অ‍্যাকাউন্টে আট কোটি টাকার বেশি জমা হয়েছে। ইডির আরও দাবি, চাকরি বিক্রি করে অর্জিত অর্থ নির্মাণ ব‍্যবসায় খাটিয়েছেন সুজিত বসু।

গত মে মাস থেকে সুজিত বসু জেলেই রয়েছেন। বুধবার তাঁর জামিন মামলার শুনানি ছিল কলকাতা হাই কোর্টে। বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে মামলার শুনানি হয়েছে। ইডির আইনজীবী তথা অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু আদালতকে জানান, তিনি মোট ৩৪০ প্রার্থীর সুপারিশ করেছিলেন। এদের মধ্যে ২৮৬ জন চাকরি পাওয়ার যোগ্যই নয়। অযোগ‍্যদের চাকরি পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মাথাপিছু ছ’লক্ষ টাকা করে নেওয়া হত। দক্ষিণ দমদম পুরসভাতেই সুজিত ২৮৪টি পদে বেআইনি ভাবে অযোগ‍্যদের নিয়োগ করেছেন। শুধুমাত্র সুজিত বসুর অ্যাকাউন্ট থেকেই আট কোটি ৮০ লক্ষ টাকা হদিশ মিলেছে। পরিবারের অন্য সদস্যের অ্যাকাউন্টেও কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক লেনদেন হয়েছে। এই টাকা পুরোনিয়েগ দুর্নীতি থেকে উপার্জন করা হয়েছে বলেও জানায় ইডি। 

ইডি আরও দাবি করে, নিয়োগ দুর্নীতি মামলার অভিযুক্ত অয়ন শীলকে জেরা করা হয়েছে। তা থেকে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছে, সুজিত বসু অযোগ‍্য প্রার্থীদের সুপারিশ করতেন। এ ছাড়াও, চাকরি পাইয়ে দিতে অন্য রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশও সুজিত পুরসভায় পাঠাতেন। এ ভাবে মোট ১৫২ জন অযোগ্যকে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় সুপারিশ করেছিলেন সুজিত বোস। 

এর জবাবে কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ জানতে চান, যাঁদের ওএমআর শিট নষ্ট করা হয়েছে, ইডি সেই প্রার্থীদের বয়ান নিয়েছে কি না। জবাবে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল এসভি রাজু বলেন, “দক্ষিণ দমদম পুরসভায় নিতাই দত্তের বাড়িতে প্রার্থীদের তালিকা পাওয়া গিয়েছে। তিনি পরিবারের সদস্যদের নামে টাকা রেখেছেন। সুজিতের মেয়ে মোহিনী বোসের নামে ৫২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা। ২০০৩ সালে ১ কোটি ৮ লক্ষেরও বেশি টাকা সুজিত বোসের হাতে ছিল। তারপর পর থেকে দফায় দফায় টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে।” 

সুজিত বোসের জামিনের বিরোধিতা করেছে ইডি। ইডির দাবি, আর্থিক তছরুপের যথাযথ প্রমাণ রয়েছে। করোনার সময় রেস্টুরেন্ট বন্ধ হওয়ার পরও টাকা এসেছে। তিনি বর্তমানে রয়েছেন। তাই তাঁকে জেলে রেখে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না তা জানতে চান বিচারপতি ঘোষ। এই প্রশ্নের জবাবে ইডির আইনজীবী বলেন, "তদন্ত এখনও চলছে। আরও অপরাধে কি আছে তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই দুর্নীতির সঙ্গে আরও অনেক কিছু লিঙ্ক থাকতে পারে। এটা সেই ধরনে দুর্নীতি, যেখানে প্রাক্তন মন্ত্রী নিজে জড়িত রয়েছেন।" মামলার পরবর্তী শুনানি ১৭ অগস্ট ধার্য করা হয়েছে। ওই দিন ইডির সওয়ালের প্রেক্ষিতে জবাবি সওয়াল করবেন সুজিত বোসের আইনজীবী।

উল্লেখ্য, ইডি নিম্ন আদালতে অভিযোগ করেছিল, কোনও অ‍্যাকাউন্ট থেকে তিন কোটি ৬৭ লক্ষ, কোনটা থেকে এক কোটি দু’লক্ষ আবার কোনটা থেকে এক কোটি আট লক্ষ টাকার লেনদেন করা হয়েছে। তার জন‍্য ১৫ থেকে ১৬টি ভুয়ো কোম্পানির অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এমনকী, সেই নিয়োগ দুর্নীতির টাকা নির্মাণ ব‍্যবসায় খাটানো হয়েছে। ইডি জানিয়েছে, ২০১৪ সালে এবিএস ইনফো জোন এবং ২০১৬ সালে একটি নির্মাণ সংস্থার কোম্পানিতে বিনিয়োগ হয়েছে সেই সময় ধৃত তৃণমূল নেতা যথাক্রমে ৬৭ শতাংশ এবং ১৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক ছিলেন। এর পাশাপাশি, রেঁস্তোরা এবং ধাবার অ‍্যাকাউন্ট খেকে কোভিডের সময় কোনও সময় এক কোটি ১১ লক্ষ টাকা, কখনও ৬৮ লক্ষ টাকা, কখনও এক কোটি ২৫ লক্ষ টাকা লেনদেন হয়েছে। এ ছাড়াও, পুরনিয়োগ দুর্নীতির টাকা শ্রীভূমি প্রাইভেট প্রোজেক্টের অ‍্যাকাউন্টে সন্দেহজনক লেনদেনের হদিশ মিলেছে।


Share