Gyanesh Kumar Issue

ভোটে কারচুপির অভিযোগ প্রমাণের দায় অভিযোগকারীর, এসআইআরের পক্ষেই সওয়াল ১২৪ জন অবসরপ্রাপ্ত আমলার, জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া হল খোলা চিঠি

অবসরপ্রাপ্ত আমলারা এ ক্ষেত্রে মনে করেন, কোনও রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জয়ী হলে কমিশনকে নিরপেক্ষ বলে মেনে নেবে। আবার পরাজিত হলে সেই একই ব্যবস্থায় অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করবে— এমন অবস্থান কখনই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৩৬

৪২ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির পরে ১২৪ জন অবসরপ্রাপ্ত আমলা এ বার নির্বাচন কমিশনের পাশে দাঁড়ালেন। ভোটে কারচুপির অভিযোগ নিয়ে চলতে থাকা রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেই নির্বাচন কমিশন এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর-এর পক্ষে সওয়াল করলেন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস, আইএফএস এবং অন্যান্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত প্রাক্তন আধিকারিকেরা। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের মতো তাঁদেরও একই বক্তব্য, পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া ভোটে কারচুপির অভিযোগ তোলা একটি অনভিপ্রেত ঘটনা। যা দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে।

শনিবার রাতে ১২৪ জন অবসরপ্রাপ্ত আমলারা একটি খোলা চিঠি জাতির উদ্দেশ্যে লিখেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ওই আমলারা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ভোটার তালিকা তৈরি, ভোটকর্মীদের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে স্ট্রং-রুমের নিরাপত্তা এবং ভোট গণনার মতো বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে তাঁদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাঁরা মনে করেন, বর্তমান দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় একাধিক স্তরের নজরদারি রয়েছে। তাঁদের দাবি, কোনও নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে অভিযোগ তুললেই তা প্রমাণিত হয়ে যায় না বরং অভিযোগের পক্ষে যথাযথ তথ্য ও প্রমাণ থাকার প্রয়োজন রয়েছে।
 

‘জিতলে ব্যবস্থা সৎ, হারলে কারচুপি— এমন হতে পারে না’

জাতির উদ্দেশ্যে লেখা খোলা চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে অবসরপ্রাপ্ত আমলারা রাজনৈতিক ফলাফলের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্যে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল (বিজেপি) পরাজিত হয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। সেই ভোটের দায়িত্ব একই নির্বাচন কমিশনের ওপরেই ছিল। সেই ফলাফল নিয়ে কিন্তু বিজয়ী দল কারচুপির অভিযোগ তোলেননি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অবসরপ্রাপ্ত আমলারা এ ক্ষেত্রে মনে করেন, কোনও রাজনৈতিক দল নির্বাচনে জয়ী হলে কমিশনকে নিরপেক্ষ বলে মেনে নেবে। আবার পরাজিত হলে সেই একই ব্যবস্থায় অসঙ্গতি রয়েছে বলে দাবি করবে— এমন অবস্থান কখনই যুক্তিসঙ্গত হতে পারে না।

 

এসআইআর-কে ভোটার তালিকাকে পরিশুদ্ধ করার প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা

খোলা চিঠিতে এসআইআর-কে ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করার একটি প্রক্রিয়া হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন তাঁরা। প্রাক্তন আমলাদের দাবি, ভোটার তালিকায় মৃত ব্যক্তির নাম, একাধিক বার নথিভুক্তদের নাম এবং স্থায়ী ভাবে অন্যত্র চলে যাওয়া ব্যক্তিদের নাম থেকে গেলে ভুয়ো ভোটদানের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিহারের উদাহরণ তুলে ধরে চিঠিতে দাবি করা হয়, সেখানে ২০০৩ সালের পর থেকে নিবিড় সংশোধন না হওয়ায় প্রায় ২২ লক্ষ মৃত ভোটার, ৭ লক্ষ ভুয়ো এবং অন্যত্র চলে যাওয়া বহু ভোটারের নাম চিহ্নিত হয়েছিল। একই সঙ্গে প্রায় ২১.৫ লক্ষ নতুন ভোটারের নাম যুক্ত হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে ওই চিঠিতে।

এ ক্ষেত্রে তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় কিছু মানুষের অসুবিধা হতে পারে। তবে সেই কারণে গোটা প্রক্রিয়াকে ভোটারদের বাদ দেওয়ার ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখাটা ঠিক নয়। তাঁদের মতে, খসড়া তালিকায় নাম না থাকলেই চূড়ান্ত ভাবে নাম বাদ পড়ে যায় না। সে ক্ষেত্রে আপত্তি জানানোর, শুনানিতে অংশ নেওয়ার এবং আবেদন করার সুযোগ থাকা জরুরি।

 

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা উল্লেখ

এসআইআর-এর আইনি বৈধতা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে খোলা চিঠিতে সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন নির্দেশ ও পর্যবেক্ষণের উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাক্তন আমলাদের দাবি, আদালত এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের ওপর নজর রেখেছিল। খসড়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম ও নাম বাদ দেওয়ার কারণ প্রকাশ, অনলাইনে দাবি জানানোর সুযোগ এবং আবেদনের ক্ষেত্রে আইনি সহায়তার মতো বিষয়গুলিতে নির্দেশ দিয়েছিল। চিঠিতে এ-ও দাবি করা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৭ মে আদালত সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের অধীনে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বহাল রেখেছিল।
 

‘সন্দেহ কখনই প্রমাণ নয়’

ভোটে অনিয়মের অভিযোগ জানানোর জন্য আইনি পথ ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত আমলারা। তাঁদের বক্তব্য, ভোটার তালিকা নিয়ে আপত্তি জানানোর পাশাপাশি হাই কোর্টে নির্বাচনী আবেদন জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে। সাংবাদিক সম্মেলনে অভিযোগ তোলার পরিবর্তে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ পেশ করা উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।

চিঠিতে বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও)-এর কাজের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত আমলারা মনে করেন, শিক্ষক ও অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়েই ভোটার তালিকা সংশোধনের কাজ করেন। প্রমাণ ছাড়া তাঁদের কাজকে প্রতারণা বলে দাগিয়ে দেওয়াটা কার্যত অন্যায়।

চিঠির শেষে নাগরিকদের নিজেদের নাম ভোটার তালিকায় রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী এবং পরিযায়ী শ্রমিকদেরও ভোটার তালিকা পরীক্ষা করতে সাহায্য করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী ব্যবস্থার ত্রুটি থাকলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকার। কিন্তু কোনও নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে বলে দাবি করলে তার পক্ষে প্রমাণও দিতে অভিযোগকারীকেই— এমনটাই মনে করেন তাঁরা।


Share