Bengal Towards Capitalism

আত্মমুগ্ধতা থেকে বিশ্ব-পুঁজিবাদের পথে, বাঙালিকে তাকাতে হবে বিশ্বপুঁজির দিকে

বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং চাহিদার সামগ্রিক পরিসর সঙ্কুচিত হলে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত সকলের উপরেই পড়ে। বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয়, এই সহজ সত্যটি আমরা দীর্ঘদিন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে চাইনি। তার ফলও কম নয়।

প্রতীকী চিত্র।
দিবাকর রায়, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:২৭

অন্য একটি সম্প্রদায়ের আর্থিক দুরবস্থায় নিজের সম্প্রদায়ের আর্থিক উন্নতি হবে—এমন ধারণা অর্থনীতির প্রাথমিক সত্যের সঙ্গেই সঙ্গতিহীন। একটি বাজারে এক পক্ষের দুর্বলতা সব সময় অন্য পক্ষের শক্তি তৈরি করে না। বরং উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং চাহিদার সামগ্রিক পরিসর সঙ্কুচিত হলে তার অভিঘাত শেষ পর্যন্ত সকলের উপরেই পড়ে। বাংলার অর্থনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালে মনে হয়, এই সহজ সত্যটি আমরা দীর্ঘদিন যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে চাইনি। তার ফলও কম নয়।
 
কলকাতার নাগরিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে অর্থনৈতিক স্বার্থের সম্পর্ক নতুন নয়। রজতকান্ত রায়ের Urban Roots of Indian Nationalism (1875–1939) গ্রন্থের প্রথম তিনটি অধ্যায়—Municipal Self-government, Pressure Groups, European Take-over—ঔপনিবেশিক কলকাতার সেই বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। কলকাতা কর্পোরেশন তখন শুধু নাগরিক প্রশাসনের প্রতিষ্ঠান ছিল না; ব্যবসায়িক স্বার্থ, পুঁজি এবং রাজনৈতিক প্রভাবের টানাপড়েনেরও একটি ক্ষেত্র ছিল।
 
পলতা জল প্রকল্প থেকে টালার জলাধার—কলকাতার জল সরবরাহের ইতিহাসেও সেই অর্থনৈতিক স্বার্থের ছাপ রয়েছে। পাইপ কে বসাবে, প্রকল্পের বরাত কে পাবে, কোন এলাকায় আগে পরিষেবা পৌঁছবে—এই প্রশ্নগুলি নিছক প্রশাসনিক ছিল না। ইউরোপীয় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলির স্বার্থ ছিল, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী গোষ্ঠীরও ছিল। অর্থাৎ নাগরিক পরিকাঠামোও তখন বৃহত্তর পুঁজি ও স্বার্থের লড়াইয়ের বাইরে ছিল না।
 
এই ইতিহাসের প্রথম শিক্ষা সম্ভবত এই যে, শিক্ষা এবং পুঁজি এক জিনিস নয়। ঔপনিবেশিক বাংলায় শিক্ষিত মধ্যবিত্তের উত্থান ঘটেছিল দ্রুত। প্রশাসন, আইন, চিকিৎসা, শিক্ষা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালি মধ্যবিত্তের আধিপত্য তৈরি হয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ শিল্প ও ব্যবসার মালিকানা সেই অনুপাতে বাঙালির হাতে আসেনি। Andrew Yule, Jardine Skinner, Balmer Lawrie-র মতো ইউরোপীয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বাংলার শিল্প-বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
 
বাঙালি শিক্ষিত হয়েছিল। পেশাজীবী হয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বও দিয়েছিল। কিন্তু বৃহৎ পুঁজি গড়ে তোলার সংস্কৃতি ততটা শক্তিশালী হয়নি।
 
এখানেই দ্বিতীয় প্রশ্নটি আসে। ইউরোপীয় ব্যবসায়িক আধিপত্যের অবসানের পর বাংলার বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে যারা আগে থেকেই ব্যবসা, অর্থায়ন, ঝুঁকি এবং বাজার পরিচালনায় অভ্যস্ত ছিল, তাদের অনেকেই স্বাভাবিক ভাবেই জায়গা করে নেয়। মারোয়াড়ি, গুজরাটি, কচ্ছি মেমন-সহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কলকাতায় দীর্ঘ বাণিজ্যিক ইতিহাস রয়েছে। বড়বাজার থেকে ক্যানিং স্ট্রিট—ব্যবসার পরিসর তাঁদের কাছে নতুন ছিল না।
 
ব্যবসায় পুঁজি কোথায় যাবে, তার একটি নিজস্ব যুক্তি আছে। যেখানে ঝুঁকি নেওয়ার অভ্যাস আছে, যেখানে লাভ পুনরায় বিনিয়োগ করার প্রবণতা আছে, যেখানে বাজার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা আছে, সেখানে পুঁজির সঞ্চয়ও সহজ হয়। তাই অন্যের হাতে পুঁজি রয়েছে—এই অভিযোগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি প্রশ্ন হল, নিজের হাতে পুঁজি তৈরি হল না কেন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাঙালির সামাজিক মানসিকতার কথাও বলতে হয়।
 
বাঙালি তার সাংস্কৃতিক সাফল্য নিয়ে গর্ব করার যথেষ্ট কারণ রাখে। সাহিত্য, সংগীত, বিজ্ঞান, শিক্ষা, রাজনীতি—বহু ক্ষেত্রে বাঙালির অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু সেই গর্ব কখনও কখনও আত্মতুষ্টিতে পরিণত হয়েছে। ব্যবসাকে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে নিচু করে দেখা, চাকরিকে নিরাপদ এবং ব্যবসাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ভাবা, ব্যর্থতাকে শিক্ষার পরিবর্তে সামাজিক লজ্জা হিসেবে দেখা—এই প্রবণতাগুলি বাঙালির উদ্যোক্তা সংস্কৃতিকে দুর্বল করেছে।
 
রাজনীতির ক্ষেত্রে আমরা যে উদ্যম দেখিয়েছি, অর্থনীতির ক্ষেত্রে সব সময় তা দেখা যায়নি। কলকাতা কর্পোরেশনের রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ে আমরা লড়েছি। সুভাষচন্দ্র বসুর মতো নেতাকে মেয়র করার রাজনৈতিক সক্ষমতা আমাদের ছিল। কিন্তু বৃহৎ শিল্প, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং পুঁজির পরিসরে একই মাত্রার দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি তৈরি করতে পারিনি।
 
অর্থাৎ, রাজনীতির ভাষা আমরা শিখেছি; পুঁজির ভাষা শিখতে দেরি করেছি। এই জায়গাতেই আজকের একটি ভুল ধারণার কথা বলা দরকার। কোনও একটি সম্প্রদায়ের ব্যবসা কমে গেলে বাঙালির ব্যবসা বাড়বে—এমন ভাবনা অর্থনীতির সরল যুক্তির সঙ্গে মেলে না। একটি বড় ব্যবসা বন্ধ হলে তার জায়গায় নতুন ব্যবসা আসতে পারে, আবার নাও আসতে পারে। তার সঙ্গে কর্মসংস্থান, সরবরাহব্যবস্থা, পরিষেবা এবং স্থানীয় বাজারের উপরেও প্রভাব পড়ে। অন্যের পতন নিজের উন্নতির নিশ্চয়তা নয়।
 
এই কারণে বাংলার অর্থনৈতিক ভাবনার পরিসর আরও বড় করা প্রয়োজন। বাঙালি বনাম অবাঙালি—এই সীমিত পরিসরে আটকে থাকলে চলবে না। প্রশ্নটি হওয়া উচিত, বিশ্বের যে বিপুল পুঁজি নতুন বিনিয়োগের জায়গা খুঁজছে, তার কতটা বাংলায় আনা সম্ভব।
 
সিঙ্গাপুরের বন্দর, দুবাইয়ের লজিস্টিকস, লন্ডনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা সান ফ্রান্সিসকোর প্রযুক্তি ও AI শিল্প—বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রগুলি ক্রমাগত বদলাচ্ছে। বিনিয়োগ এখন কেবল পুঁজি নয়; প্রযুক্তি, দক্ষতা, পরিকাঠামো, বাজার এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার সন্ধান করে।
 
কলকাতার অতীতের গৌরব তাই যথেষ্ট নয়। নতুন করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাই আসল চ্যালেঞ্জ। এখানে বাঙালির একটি বড় সম্পদ রয়েছে—তার বিশ্বব্যাপী মানবসম্পদ।
 
বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং গবেষণাক্ষেত্রে বাঙালির উপস্থিতি রয়েছে। এই প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক পেশাজীবী নেটওয়ার্ককে যদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং উদ্যোক্তা উদ্যোগের সঙ্গে বাংলার যোগসূত্র হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তা হলে সেটি বড় সম্পদ হয়ে উঠতে পারে।
 
কিন্তু তার জন্য মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। ক্যাপিটালিজম মানে শুধু অর্থের প্রতি আকর্ষণ নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ঝুঁকি নেওয়া, ব্যর্থতা থেকে শেখা এবং প্রতিযোগিতার মানসিকতা। ব্যবসায় ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবন ব্যর্থ হওয়া নয়। নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা অনেক সময় পরবর্তী সাফল্যের পূর্বশর্ত।
 
আর প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটিও বদলাতে হবে। শুধু বড়বাজারের অন্য ব্যবসায়ীর সঙ্গে নয়, ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া কিংবা বিশ্বের অন্য উৎপাদন ও পরিষেবা কেন্দ্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে।
 
বাংলাদেশ তৈরি পোশাকে বিশ্ববাজারে নিজের জায়গা তৈরি করেছে। ভিয়েতনাম ইলেকট্রনিক্স ও উৎপাদন শিল্পে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টানছে। এই বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে যদি আমাদের আলোচনার মূল বিষয় হয়ে থাকে বাঙালি বনাম অবাঙালি, তা হলে আমরা আসল প্রতিযোগিতাটিই ভুল জায়গায় খুঁজছি।
 
বাংলার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কোনও একটি সম্প্রদায়ের পরাজয়ের উপর নির্ভর করে না। নির্ভর করে বাংলার নিজের সক্ষমতার উপর।
অন্যের ব্যবসা বন্ধ হওয়ার অপেক্ষা না করে নতুন ব্যবসা তৈরি করতে হবে। অন্যের পুঁজি নিয়ে অভিযোগ না করে নিজের পুঁজি তৈরি করতে হবে। স্থানীয় বাজারের সীমা পেরিয়ে বিশ্ববাজারে পৌঁছতে হবে।
 
কর্পোরেশনের ক্ষমতার পাশাপাশি কোম্পানির বোর্ডরুমেও জায়গা তৈরি করতে হবে। স্লোগানের পাশাপাশি স্টার্টআপ তৈরি করতে হবে।চাকরির পাশাপাশি উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। আর আত্মমুগ্ধতার বদলে প্রয়োজন আত্মবিশ্বাস।
 
বাঙালির সামনে তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত খুব সরল— অন্যের পুঁজি নিয়ে আক্ষেপ, না কি বিশ্বপুঁজির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজের জায়গা তৈরি করা?


Share