Flight Clash

আহমেদাবাদ বিমান বিপর্যয়ের এক বছর, ২৬০ প্রাণহানির রহস্য এখনও অধরা, প্রকাশ্যে এল না চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট

তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, রিপোর্ট সম্পূর্ণ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। নিয়ম মেনে সংস্থাটি একটি অন্তর্বর্তী বা স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

আহমেদাবাদে বিমান দুর্ঘটনা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, আহমেদাবাদ
  • শেষ আপডেট: ১২ জুন ২০২৬ ০৫:৪৭

এক বছর পেরিয়ে গেল। তবুও সেই দুঃস্বপ্ন আজও তাড়া করে বেড়ায় বহু মানুষকে। ২০২৫ সালের ১২ জুন, আহমেদাবাদ বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে ওড়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার। ভয়াবহ সেই দুর্ঘটনায় যাত্রী ও বিমানকর্মী-সহ অন্তত ২৬০ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বিশ্বের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম ভয়ঙ্কর বিমান দুর্ঘটনার এক বছর পূর্ণ হলেও এখনও প্রকাশ্যে আসেনি চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট।

আন্তর্জাতিক অসামরিক বিমান পরিবহণ সংস্থার নিয়ম অনুযায়ী, কোনও বড় বিমান দুর্ঘটনার এক বছরের মধ্যে তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা প্রয়োজন। কিন্তু ভারতের ‘এয়ারক্র্যাফ্ট অ্যাক্সিডেন্ট ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো’ এখনও সেই রিপোর্ট প্রকাশ করতে পারেনি। তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, রিপোর্ট সম্পূর্ণ করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। নিয়ম মেনে সংস্থাটি একটি অন্তর্বর্তী বা স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তদন্তে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি যুক্ত রয়েছে মার্কিন জাতীয় পরিবহণ নিরাপত্তা বোর্ডও। সূত্রের খবর, দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানের ইঞ্জিনের ফরেন্সিক ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এখনও শেষ হয়নি। সেই কারণেই বিলম্ব হচ্ছে চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশে। গত কয়েক মাসে ইঞ্জিনের একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞদের একটি দল তদন্তের সূত্র খুঁজতে ফ্রান্সেও গিয়েছিল। বর্তমানে আরও বিশদ পরীক্ষার জন্য ইঞ্জিনটি আমেরিকায় পাঠানো হয়েছে।

দুর্ঘটনার পর প্রকাশিত প্রাথমিক তদন্ত রিপোর্টে ককপিট ভয়েস রেকর্ডারের তথ্য সামনে আসতেই ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছিল। রিপোর্টে জানা যায়, উড্ডয়নের কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানের দুই ইঞ্জিনে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। জ্বালানি নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ সুইচগুলি ‘রান’ মোড থেকে ‘কাট অফ’ অবস্থায় চলে গিয়েছিল।

রেকর্ডারে ধরা পড়া দুই পাইলটের কথোপকথনও নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়। এক পাইলট অন্যজনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘জ্বালানির সুইচ কেন বন্ধ করলে?’’ জবাবে অপরজন বলেন, ‘‘আমি কিছু বন্ধ করিনি।’’ তবে তদন্তকারীরা এখনও নিশ্চিত করতে পারেননি কোন কণ্ঠস্বর কার ছিল। এই পরিস্থিতিতে মৃত ক্যাপ্টেন সুমিত সবরওয়ালের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলে তাঁর বাবা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন।

এ দিকে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে এয়ার ইন্ডিয়া। সংস্থার দাবি, ক্ষতিপূরণ গ্রহণের বিষয়ে কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এবং পরিবারের উপর কোনও চাপও সৃষ্টি করা হচ্ছে না। তবুও বহু পরিবার এখনও সেই অর্থ নিতে রাজি নন। তাঁদের বক্তব্য, চূড়ান্ত তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। বিমান সংস্থার কোনও গাফিলতি প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে আইনি পদক্ষেপের পথ খোলা রাখতেই এই অবস্থান।

কিন্তু তদন্ত, রিপোর্ট বা ক্ষতিপূরণের বাইরেও রয়েছে অসংখ্য মানুষের ব্যক্তিগত বেদনার গল্প। লন্ডনে পড়তে যাওয়া ২৫ বছরের ফাইজানকে হারিয়ে আজও বিমানবন্দরের দিকেও তাকাতে পারেন না তাঁর বাবা রফিক আরব। মেয়ের কাছে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে জীবনের প্রথম বিমানযাত্রায় বেরিয়ে আর ফেরেননি অর্জুন ও দিব্যা ভানসাদিয়া। তাঁদের মেয়ে মুক্তি আজও সেই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি; চাকরি ছেড়ে মানসিক চিকিৎসা ও কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নিতে হচ্ছে তাঁকে।

বিমানের ২৪২ জন আরোহীর মধ্যে একমাত্র জীবিত উদ্ধার হওয়া বিশ্বাস কুমার রমেশ এখনও মানসিক আঘাত থেকে পুরোপুরি মুক্ত নন। ভাইয়ের দেহ শনাক্ত করার স্মৃতি তাঁকে তাড়া করে ফেরে। অন্য দিকে, বিমানটি যে মেডিকেল কলেজ হস্টেলে আছড়ে পড়েছিল, সেখানে প্রাণ হারান আরও ১৯ জন। দুর্ঘটনার সময় রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে গুরুতর দগ্ধ হন নববিবাহিত অজয় পারমার। দুই হাত-পা হারিয়ে, কর্মজীবন হারিয়ে এবং ব্যক্তিগত জীবনের ভাঙনের যন্ত্রণা বয়ে আজও বেঁচে আছেন তিনি।

এক বছর পরও আহমেদাবাদের সেই কালো দিনের ক্ষত শুকোয়নি। তদন্তের উত্তর এখনও অধরা, কিন্তু স্বজনহারাদের হৃদয়ের শূন্যতা আরও গভীর হয়েছে। ২৬০টি প্রাণহানির এই ট্র্যাজেডি আবারও মনে করিয়ে দেয় কিছু ক্ষতির মূল্য কোনও ক্ষতিপূরণে মেটে না, কোনও রিপোর্টে শেষ হয় না।


Share