Assembly

স্বাধীনতার পরে ‘রেকর্ড’ ভোটদান, কী কারণে বাজিমাত, ইঙ্গিত দিল নির্বাচন কমিশন

রাজ‍্যের মুখ‍্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল বলেছেন, “ভোটাররা নির্ভয় ভোট দিয়েছেন। ভোট দেওয়ার পর তারা খুশি হয়েছেন। ঘটনা অনেক কম হয়েছে। তাই রাজনৈতিক দল এবং সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের ধন্যবাদ।”

(বাঁ দিক থেকে) বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৯

বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। ১৫২টি আসনে ভোটদানের হার প্রায় ৯৩ শতাংশ। যা রাজ‍্যের নির্বাচনী ইতিহাসে কার্যত ‘রেকর্ড’। স্বাধীনতার পরে নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বাধিক বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নির্বাচন কমিশন ভোটের আগে থেকেই একাধিক পদক্ষেপ করেছে। তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেই ‘বাজিমাত’ করেছে নির্বাচন কমিশন। কমিশন চাইলে যে ‘নির্বাচনী সন্ত্রাস’ রুখে দিতে পারে তা বৃহস্পতিবার দেখিয়ে দিয়েছেন কমিশন নিযুক্ত বিশেষ পর্যবেক্ষক সুব্রত গুপ্ত এবং রাজ‍্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল।

বৃহস্পতিবার নির্বাচন শেষ হওয়ার পরে সাংবাদিক সম্মেলন করেন রাজ‍্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল এবং রাজ‍্য পুলিশের নোডাল অফিসার আনন্দ কুমার। কমিশন দাবি করেছে, এই যে ৯০ শতাংশের ওপরে ভোটগ্রহণ হয়েছে তা ‘রেকর্ড’। গত নির্বাচনের তুলনায় ভোটদানের গড় অনেকটাই বেড়েছে।

ভোটের আগে থেকে একাধিক পদক্ষেপ করেছে নির্বাচন কমিশন। ভোট শান্তিপূর্ণ ভাবে যাতে সম্পন্ন হয় তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর ছিল নির্বাচন কমিশন। রাজ‍্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক বারে বারে রাজ‍্যবাসীকে আস্বস্ত করেছেন। বলেছিলেন, “আপনারা নির্ভয়ে ভোট দিতে যাবেন। কোনও সমস্যা হবে না।” যেমন কথা তেমন কাজ। কথা দিয়েছিলেন। কথা রাখলেন।

এ বারে নির্বাচন কমিশনের মূল দায়িত্ব বুথকে সুরক্ষিত করা। তার সঙ্গে ভোটারা নির্বিঘ্নে এবং নির্ভয়ে যাতে ভোট দিতে যেতে পারেন তার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। প্রথমেই বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে ভোটার ছাড়া কাউকে ধারে কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয়নি। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়ালের কথায়, আগের সবকটি নির্বাচনেই বুথের ১০০ মিটারের মধ্যে অবৈধ জমায়েত হত। সেখান থেকে ভোটারদের প্রভাবিত করা হত। এমনকী, ভোট কর্মী যাঁরা নির্বাচন করাতে আসতেন তাঁদেরকে প্রভাবিত করা হত। তাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত হত। তা এ বারে আর করতে দেওয়া হয়নি। তাই কোনও ছাপ্পা ভোটের অভিযোগও ওঠেনি।

আবার ভোটের অনেক আগে থেকে রাজ্যে কেন্দ্রীয় বাহিনী চলে এসেছে। তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় রুটমার্চ করেছে। দেখা গিয়েছিল, কেন্দ্রীয় বাহিনী তৃণমূলের ইফতার পার্টিতে যোগ দিয়েছে। খবর পেয়েই সাসপেন্ড করে দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানকেও যে সাসপেন্ড করতে পারে কমিশন তা তাঁরা নিদর্শন তৈরি করতে পেরেছেন। নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যাতে কোনও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ না ওঠে তা নিশ্চিত করে কমিশন।

বাহিনী এবং পুলিশ নির্বাচনের অন‍্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁদের ওপরেই দায়িত্ব অর্পণ করা হয় যাতে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। যদি না হয় তাহলে তাঁদের বিরুদ্ধেও কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নির্বাচনের আগে থেকে এলাকার দাগী অপরাধীদের চিহ্নিত করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। এফআইআরে নাম থাকা সত্ত্বেও কেন ব‍্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তার অভিযোগ থানার ওসিকে সাসপেন্ড, বদলি করে নিদর্শন তৈরি করে নির্বাচন কমিশন। ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ বিভিন্ন এলাকার তৃণমূলের নেতাদেরও গ্রেফতার করা হয়। রাজ‍্য পুলিশের নোডাল অফিসার আনন্দ কুমার জানিয়েছেন, বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রিক অশান্তির ঘটনায় ৪১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবারে ৫৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে (প্রিভেনটিভ এরেস্ট)। এই একচল্লিশ জনের মধ্যে তিনজন দুবরাজপুরের, পাঁচজন কুমারগঞ্জে, চারজন সাইথিঁয়ায় এবং মুরারই থেকে চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার তার জন‍্য কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও ধন্যবাদ জানিয়েছেন মনোজকুমার আগরওয়াল।

ওয়েবকাস্টিং ক‍্যামেরা নিয়ে গত লোকসভা নির্বাচনে একাধিক অভিযোগ করেছিল বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগ ছিল, ক‍্যামেরা বন্ধ করে ছাপ্পা ভোট হয়েছিল। রাজ‍্যের প্রাক্তন মুখ‍্য নির্বাচনী আধিকারিক আরিজ আবতাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন। আরিজ আইপ‍্যাকের লোক নির্বাচন কমিশনের অফিসে বসিয়ে তা পরিচালনা করেছিল বলেও দাবি করেছিলেন। কিন্তু সেই সবকিছু থেকে শিক্ষা নিয়েছে কমিশন।

রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন, ওয়েবকাস্টিং ১০০ শতাংশ নিশ্চিত এবং নির্ভুল করা হয়েছে। তাঁর কথায়, বুথের ভিতরে কোথায় ক্যামেরা বসানো হবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এর আগে দেখা গিয়েছিল, আলোর ছিল না অথবা ইলেকট্রিকের সমস্যা ছিল। যেখানে ইলেকট্রিকের অসুবিধা ছিল, সেখানে জেনারেটর বসানো হয়েছিল। যেখানে ইন্টারনেট নেই সেখানে অন‍্য প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি জানান, সেখানে ‘সিম বেসড ক্যামেরা’ ব্যবহার করা হয়েছে। ওই সিম বেসড ক্যামেরা যেখানে ছিল সেখানে মাইক্রো অবজারভার ছিল। প্রতি ১৫ মিনিটে আমরা রিটার্নিং অফিসারের কাছে খোঁজ নিয়েছি।”

বুথের ভিতরে কী হচ্ছে তা ত্রিস্তরীয় বলয়ে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রিটার্নিং অফিসার, জেলা নির্বাচনী আধিকারিক এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর থেকে তদারকি করা হয়েছে। তার জন্য মাইক্রো অবজার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে। তাঁদের জন্যও নির্দিষ্ট নির্দেশিকা বেধে দেওয়া হয়েছে। বুথের ভিতরে কারা ঢুকছেন বা কারা বেরিয়ে যাচ্ছেন তা স্পষ্ট দেখা গিয়েছে বলেও জানান রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল। আর তা গোটাটাই লাইভ কাস্ট করা হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, স্বাধীনতার পরে এই প্রথম নির্বাচন যেখানে ৯০ শতাংশের ওপরে ভোটদান হয়েছে। রাজ‍্যের মুখ‍্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজকুমার আগরওয়াল বলেছেন, “ভোটাররা নির্ভয় ভোট দিয়েছেন। ভোট দেওয়ার পর তারা খুশি হয়েছেন। ঘটনা অনেক কম হয়েছে। তাই রাজনৈতিক দল এবং সমস্ত স্টেক হোল্ডারদের ধন্যবাদ।” এসআইআরের পরে এটাই প্রথম নির্বাচন। তাতে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত এবং ভুয়ো ভোটার বাদ যাওয়ার কারণে এই বিপুল ভোটদান হয়েছে বলে মনে করেছেন ভোটকুশলীরা। তবে এর পিছনে রাজনৈতিক কোনও কারণ রয়েছে কি না তা ৪মে স্পষ্ট হয়ে যাবে।


Share