TMC Political Crisis

গ্রেফতার অদিতি মুন্সীর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তী, পুরুলিয়া থেকে ধৃত প্রভাবশালী প্রাক্তন তৃণমূল কাউন্সিলর

হিসেব বহির্ভূত সম্পত্তি করার অভিযোগে অদিতি মুন্সী এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। বাগুইআটি থানার একটি অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা শুরু হয়েছিল।

(বাঁ দিক থেকে) দেবরাজ চক্রবর্তী এবং অদিতি মুন্সী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ ০৮:৩৮

প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অদিতি মুন্সীর স্বামী দেবরাজ চক্রবর্তীকে গ্রেফতার করল পুলিশ। বুধবার পুরুলিয়া থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তোলাবাজি, জোর করে জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে দেবরাজের বিরুদ্ধে। রক্ষাকবচ চেয়ে অদিতি এবং দেবরাজ কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন। অদিতি রক্ষাকবচ পেলেও দেবরাজের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ হয়।

হিসেব বহির্ভূত সম্পত্তি করার অভিযোগে অদিতি মুন্সী এবং দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে। বাগুইআটি থানার একটি অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা শুরু হয়েছিল। অভিযোগ, তিনি ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে ১০০ কোটি টাকার সম্পত্তি বেনামে এবং আত্মীয় পরিজনদের নামে হস্তান্তর করেছেন। এতে নাম জড়িয়ে রাজারহাট-গোপালপুরে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক অদিতি মুন্সীর নামও। দেবরাজ নিজেও বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলর ছিলেন। এলাকায় যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিলেন। দম্পতির বিরুদ্ধে হিসেব বহির্ভূত সম্পত্তি, সেই সংক্রান্ত তথ‍্য গোপন এবং বিদেশে অর্থপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এমনকী, দেবরাজ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে নির্বাচনী হলফনামায় সম্পত্তির হিসেব গোপন করার মতো অভিযোগ রয়েছে। কালীঘাট তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বলেই পরিচিত এই দেবরাজ।

পুলিশ সূত্রে খবর, অভিজিৎ সাহা নামে এক প্রেমোটার দেবরাজের বিরুদ্ধে বাগুইআটি থানায় অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। অভিযোগ, কেষ্টপুরের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডে একটি নির্মাণকাজের সময় তাঁকে এবং তাঁর লোকজনকে বাধা দেওয়া হয়। দেবরাজের নির্দেশে মণীশ মুখোপাধ্যায় এবং সাগরেদরা এই কাজ করেছিলেন। তাঁরা ওই প্রোমোটারের কাছ থেকে মোটা টাকা দাবি করেছিলেন। বলা হয়েছিল, টাকা না দিলে প্রাণে মেরে ফেলা হবে। তৃণমূল জমানায় ওই প্রোমোটার অভিযুক্তদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে ওই নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাতে তার বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়। অভিযোগকারী জানিয়েছেন, চাপের মুখে নতিস্বীকার করে দেবরাজকে ৩০ লক্ষ টাকা এবং তাঁর সহযোগী মণীশকে আরও পাঁচ লক্ষ টাকা তিনি দিয়েছিলেন। কিন্তু তার পর আরও টাকা চাওয়া হচ্ছিল। টাকা না পৌঁছোলে কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। দেবরাজদের কঠিন শাস্তি দাবি করেছেন। পাশাপাশি ওই প্রোমোটার ঘুষের টাকা ফেরতেরও দাবি জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগের ভিত্তিতে বাগুইআটি থানার পুলিশ ভারতীয় ন্যায় সংহিতার সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে। বুধবার বিধাননগর পুলিশ এবং রাজ্য এসটিএফ-এর যৌথ অভিযানে পুরুলিয়া থেকে দেবরাজকে গ্রেফতার করা হয়।

বিধাননগরের এলাকাজুড়ে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট চালানো, জমি দখলের বিবিধ অভিযোগ রয়েছে দেবরাজের বিরুদ্ধে। ২০২১ সালে ভোট পরবর্তী হিংসার মামলাতেও তিনি অভিযুক্ত। দেবরাজের ঘনিষ্ঠ হিসাবে পরিচিত দু’জনকে সম্প্রতি গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।

গ্রেফতারি এড়াতে রক্ষাকবচ চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন দম্পতি। আদালত দেবরাজকে এক বার রক্ষাকবচ পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় বার আর তা দেওয়া হয়নি। আদালত জানিয়েছিল, অদিতির চার মাসের শিশুসন্তান রয়েছে। তাই তাঁর আগাম জামিনের আবেদন মঞ্জুর করা হচ্ছে। তবে দেবরাজ তা পাবেন না। দম্পতিকে তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশও দিয়েছিলেন বিচারপতি। তার পর তোলাবাজি, ভয় দেখানোর অভিযোগে দেবরাজকে গ্রেফতার করা হল।

উল্লেখ্য, দেবরাজ বর্তমানে বিধাননগরের তৃণমূল প্রক্তন কাউন্সিলর। মেয়র পারিষদও ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরেই তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত তিনি। এক সময় প্রাক্তন কৃষিমন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসুর আপ্তসহায়ক ছিলেন। ২০১৩ সালে বিধাননগর পুরসভায় একটি উপনির্বাচন হয়েছিল। সূত্রের খবর, তাতে টিকিট চেয়ে পূর্ণেন্দুর কাছে দরবার করেছিলেন দেবরাজ। তৃণমূল তাঁকে তখন টিকিট দেয়নি। পরে ২০১৫ সালের নির্বাচনের সময়ে ফের ভোটে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন দেবরাজ। টিকিট না পেয়ে দল ছেড়ে দেন। তারপরে কংগ্রেসের হাত ধরেন। পূর্ণেন্দুর আপ্তসহায়কের কাজ ছেড়ে দেন।

শোনা যায়, বিধাননগরে ভোটে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে তৎকালীন মন্ত্রী পূর্ণেন্দু বসু ও তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেনের সঙ্গে দেবরাজের বিবাদ চরমে উঠেছিল। জানা যায়, সেই বিবাদের জেরেই তৃণমূলের টিকিট পাননি তিনি। বিধাননগর পুরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কংগ্রেসের টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন তিনি। সেই সময়ে ভোটের দিন দেবরাজকে বিধাননগর কমিশনারেটের পুলিশ গ্রেফতার করেছিল। বন্দি অবস্থায় তাঁকে ভোটে লড়তে হয়েছিল। ভোটে জিতে বিধাননগরের কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। জামিনে মুক্ত হয়ে কাউন্সিলর হিসাবে শপথ নেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই কংগ্রেস ছেড়ে ফের তৃণমূলে যোগ দেন দেবরাজ।

দেবরাজ চক্রবর্তী রাজনৈতিক মহলে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। বিধাননগর তথা উত্তর ২৪ পরগনা জেলার তৃণমূলের একজন দাপুটে নেতা হিসাবেই তিনি পরিচিত। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিধাননগর পুরনিগমের ভোটে দ্বিতীয় বার নির্বাচিত হয়ে মেয়র পারিষদ হন দেবরাজ।


Share