Middle East Conflict

ইরানকে ঘিরে ফের যুদ্ধের আঁচ, হরমুজে অচলাবস্থার আশঙ্কা! ১০ হাজার আমেরিকা সেনা মোতায়েনের খবরে ক্রমশ বাড়ছে তেলের দাম

আমেরিকার নৌবাহিনী নতুন একটি স্ট্রাইক গ্রুপ-সহ প্রায় ১০ হাজার সেনা পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন করতে পারে—এমন খবর প্রকাশ্যে আসতেই হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে অচলাবস্থার আশঙ্কা। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে।

হরমুজ প্রণালী।
নিজস্ব সংবাদদাতা, আমেরিকা
  • শেষ আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ১২:১৭

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারি দেওয়ার পর পশ্চিম এশিয়ায় উত্তেজনা আরও বাড়তে শুরু করেছে। আমেরিকার নৌবাহিনী নতুন একটি স্ট্রাইক গ্রুপ-সহ প্রায় ১০ হাজার সেনা পশ্চিম এশিয়ায় মোতায়েন করতে পারে—এমন খবর প্রকাশ্যে আসতেই হরমুজ প্রণালী ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন করে অচলাবস্থার আশঙ্কা। তার সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে। শুক্রবার ফের বেড়েছে অশোধিত তেলের দাম।

এ দিন ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১০২ থেকে বেড়ে ১০৬ ডলারের মধ্যে পৌঁছেছে। একই সময়ে আমেরিকার ডব্লিউটিআই ক্রুডের দাম উঠেছে ৯২ থেকে ৯৪ ডলারে। একটি ব্যারেলে প্রায় ১৫৯ লিটার বা সঠিক হিসাবে ১৫৮.৯৮৭ লিটার তেল থাকে। তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ভারতের উপরও পড়তে পারে। কারণ, দেশের মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটানো হয়।

ভারতের ক্ষেত্রে ব্রেন্ট ক্রুডের পাশাপাশি ওমান ও দুবাইয়ের অপরিশোধিত তেলের দামও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুই ধরনের ক্রুডের দামের ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় ‘ইন্ডিয়ান বাস্কেট’-এর দাম। মঙ্গলবার সেই ইন্ডিয়ান বাস্কেটের দাম পৌঁছেছে ব্যারেলে ১১৭.৮ ডলারে। অথচ সেপ্টেম্বরের গোড়ায়, অর্থাৎ মাত্র এক মাস আগেও এর দাম ছিল প্রায় ১০৭ ডলার। ফলে পশ্চিম এশিয়ায় নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় ভারতের জ্বালানি বাজারেও চাপ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

আমেরিকার সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস থিওডর রুজভেল্টের নেতৃত্বে একাধিক যুদ্ধজাহাজ নিয়ে তৈরি একটি স্ট্রাইক গ্রুপ গত রবিবার ক্যালিফোর্নিয়ার সান দিয়েগো ঘাঁটি ছেড়ে পশ্চিম এশিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। তার পরের দিনই রওনা দেয় ‘মাকিন আইল্যান্ড মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিট’ বা এমইইউ। সেখানে রয়েছেন দু'হাজারের বেশি মেরিন সেনা। সব মিলিয়ে ওই স্ট্রাইক গ্রুপ এবং আমেরিকার নৌবাহিনীর অন্যান্য ইউনিটে আরও নয় থেকে ১০ হাজার সেনা যুক্ত হতে পারেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালী এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথকে ঘিরে উত্তেজনা এবং ইরানের তরফে কয়েকটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলার খবর আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সেন্টকম যদি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করে, তা হলে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, হরমুজ প্রণালী ছাড়া পশ্চিম এশিয়া থেকে তেল আনার বিকল্প পথ কতটা কার্যকর? সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২৫ শতাংশই ইরান-যুদ্ধের আগে হরমুজ় প্রণালী দিয়ে যেত। ইরাক, কুয়েত, বাহরিন ও কাতার থেকে তেল পরিবহণের ক্ষেত্রে এই জলপথের কার্যত কোনও বিকল্প নেই। সৌদি আরব থেকে অবশ্য লোহিত সাগর হয়ে তেল পরিবহণ করা সম্ভব। কিন্তু সেই পথে রয়েছে আর একটি বড় সমস্যা—এডেন উপসাগরের প্রবেশপথে বাব আল-মান্দেব প্রণালী। সেখানে হুথিদের উপস্থিতি থাকায় ওই পথেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সৌদি আরবের জাহাজকে এই পথে যেতে দেওয়া হবে না বলে আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথিরা।

সৌদি আরব থেকে ভারতে তেল আনার আরও একটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে—লোহিত সাগর দিয়ে বাব আল-মান্দেবের দিকে না গিয়ে সুয়েজ খাল হয়ে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছনো। কিন্তু সেটিও দীর্ঘ এবং ব্যয়বহুল পথ। সুয়েজ খাল পেরিয়ে ভূমধ্যসাগর থেকে জিব্রাল্টার প্রণালী হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে যেতে হবে। তার পর পুরো আফ্রিকা ঘুরে উত্তমাশা অন্তরীপ পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে ঢুকতে হবে। সেখান থেকে আরব সাগর হয়ে মুম্বই বা গুজরাতে পৌঁছোবে তেলবাহী জাহাজ। ফলে স্বাভাবিক পথের তুলনায় সময় লাগতে পারে আরও ১০ থেকে ১৫ দিন। বাড়বে পরিবহণ খরচও।

আন্তর্জাতিক তেল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ‘ফ্রি অন বোর্ড’ বা এফওবি পদ্ধতি ব্যাপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। এই ব্যবস্থায় জাহাজে তেল তোলা পর্যন্ত বিক্রেতার দায়িত্ব। পণ্য জাহাজে ওঠার পর থেকে পরিবহণ, বিমা এবং অন্যান্য ঝুঁকি ও খরচের দায়িত্ব ক্রেতার। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের পরিস্থিতিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যেই বিমা খরচ বেড়েছে। ফলে দীর্ঘ ঘুরপথে তেল আনতে হলে পরিবহণ ও বিমা—দুই ক্ষেত্রেই খরচ আরও বাড়বে।

এই পরিস্থিতিতে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ-সঙ্কট সামাল দিতে শুক্রবার যৌথ উদ্যোগ নিয়েছে শিল্পোন্নত সাতটি দেশের জোট জি৭। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী চার মাস ধরে আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএ-র মাধ্যমে জরুরি মজুত থেকে ১০০ মিলিয়ন বা ১০ কোটি ব্যারেল অশোধিত তেল ও জ্বালানি পণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে ছাড়া হবে। এর পাশাপাশি, প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানিয়েছে জি৭।


Share