Human Trafficking

‘আমায় দেশে ফিরিয়ে নে’, শ‍্যামপুকুর থেকে নিখোঁজ, বাংলাদেশের হাসপাতাল থেকে ভাইকে ফোন করে ‘আর্তনাদ’ বোনের, থানায় অভিযোগ দায়ের

নিখোঁজ তরুণীর নাম মধুমিতা মিস্ত্রি মন্ডল। তিনি আদতে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি থানার পশ্চিম মণিপুরের বাসিন্দা। বেশ কয়েক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়। মধুমিতার একটি সন্তানও রয়েছে।

প্রতীকী চিত্র।
ইন্দ্রজিৎ মল্লিক, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৭ আগস্ট ২০২৬ ০১:৩৪

চাকরির খোঁজে শ‍্যামপুকুর থেকে নিখোঁজ হলেন তরুণী। বাংলাদেশের হাসপাতাল থেকে তরুণীর ভাইয়ের কাছে এল ফোন। ক্ষীণ গলায় বললেন, ‘ভাই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে নে। বাংলাদেশে আছি।’ 

নিখোঁজ তরুণীর নাম মধুমিতা মিস্ত্রি মন্ডল। তিনি আদতে উত্তর ২৪ পরগনার সন্দেশখালি থানার পশ্চিম মণিপুরের বাসিন্দা। বেশ কয়েক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়। মধুমিতার একটি সন্তানও রয়েছে। কিন্তু পারিবারিক অশান্তির কারণে কলকাতার শ‍্যামপুকুর থানার গালিফ স্ট্রিটে তাঁর ভাইয়ের কাছে চলে আসেন। তাঁর ভাই দীপঙ্কর মিস্ত্রি পরিবারের মুখে ভাত জোটাতে একমাত্র রোজগেরে। এর ফলে মধুমিতা এবং তাঁর সন্তানের জন‍্য প্রতিদিন ভাট জোটাতে সমস‍্যার সম্মুখীন হতে হয়। 

ভাই দীপঙ্করের বক্তব্য, এর পরেই মধুমিতাও ঠিক করে তিনিও অর্থ উপার্জন করতে কাজ করবেন। সেই মতো তাঁর ভাইকে জানায়, তাঁর সঙ্গে সমাজমাধ‍্যমে এক ব‍্যক্তির আলাপ হয়েছে। ওই ব‍্যক্তি মধুমিতাকে একটি ওয়ার্কশপে কাজ দেওয়ার কথা জানায়। তবে সেটা পশ্চিমবঙ্গে নয়, সুদূর তামিলনাড়ুতে। মোটা টাকা বেতন দেবে বলেও জানায় সে। সেখানে কাজ করতে যাওয়ার জন‍্য রাজি হন। গত ১ জুলাই মধুমিতা গালিফ স্ট্রিটের বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন তামিলনাড়ুর উদ্দেশ্যে।

সেটা হল কাল। ভাই দীপঙ্কর মিস্ত্রি জানিয়েছেন, মধুমিতা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ অনিয়মিত হয়ে পড়ে। তার পরে আচমকাই তাঁর মোবাইল বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ি থেকে বের হওয়ার ১৭ দিন পরে গত ১৮ জুলাই, দীপঙ্কর‍ের নম্বরে একটি ফোন আসে। যেটি ভারতীয় নম্বর নয়। নম্বরটি শুরু হয় ‘+৮৮’ দিয়ে। অর্থাৎ বাংলাদেশের।

দীপঙ্কর জানিয়েছেন, “ফোনের ওপরে থাকা মহিলা আমার বোন মধুমিতা। বলছে, আমি গোপালঞ্জের একটি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছি। আমাকে কয়েক জন মিলে অপহরণ করেছে। তার পরে বলপূর্বক আন্তর্জাতিক সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। আমি কোনও মতে তাঁদের হাত থেকে পালিয়েছি।” এর পরেই ভাইয়ের কাছে ‘আর্তনাদ’ জানিয়ে বলে, “আমায় এখান থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব‍্যবস্থা কর।” হাসপাতালে থাকা অন‍্য রোগীর পরিবারের সদস্যদের ফোন থেকে ফোন করা হয়েছে বলেও জানিয়েছে দীপঙ্কর।

এর পরে দেরি না করে দীপঙ্কর শ‍্যামপুকুর থানায় যান। ঘটনাটি পুলিশকে জানান। তাঁর বোনের অবস্থান চিহ্নিত করে দ্রুত পদক্ষেপ করার জন‍্য দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, কর্তব্যরত পুলিশকর্মীরা তাঁকে নির্দিষ্ট থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পরামর্শ দেয়। তাঁর অভিযোগ, এর নেপথ্যে সংঘটিত আন্তর্জাতিক মানব পাচারচক্র কাজ করছে। আন্তঃরাজ‍্য মানব পাচারচক্র এর নেপথ্যে রয়েছে। তাই কোথায় গিয়ে অভিযোগ জানাবেন তা তিনি বুঝতে পারছেন না।

তিনি অভিযোগপত্রে এ-ও উল্লেখ করেছেন, পুলিশ এখনও পর্যন্ত কোনও যথাযথ পদক্ষেপ করেনি। যদিও পরবর্তীতে দীপঙ্করের অভিযোগ একটি সাধারণ ডায়েরি আকারে নেওয়া হয়। রাজ‍্য পুলিশের ডিজি, সিআইডির অতিরিক্ত ডিজি, মানব পাচার দমন শাখা, কলকাতা পুলিশের কমিশনার এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে সেই চিঠি দিয়েছেন। 

দীপঙ্করের আরও বক্তব্য, আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা মহিলাদের পাচারকারীরা বারবার নিশানা করছে। প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে পাচার করে দেওয়া হচ্ছে। এই চক্র সীমান্ত এলাকায় সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের পর্দাফাঁস হওয়াটা অত্যন্ত জরুরি যাতে এমন ঘটনা আর কারও সঙ্গে না হয়। তাঁর দাবি, এলাকার সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হোক। ভ্রমণ সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হোক। মোবাইলের কল রেকর্ড খতিয়ে দেখা হোক। এর পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের তথ্য যাচাই করা হোক।

অপর দিকে অপহৃত তরুণী মধুমিতা মন্ডল মিস্ত্রির স্বামী সন্দেশখালি থানাতেও একটি মামলা দায়ের করেছেন। পুলিশ সূত্রের খবর, শ‍্যামপুকুর থানার পুলিশ প্রাথমিক ভাবে খোঁজখবর নিয়েছে। পুলিশ ভুল বুঝিয়ে অপহরণ এবং মানব পাচারের অভিযোগে ভারতীয় ন‍্যায় সংহিতার ১৩৮ এবং ১৪৩(১) ধারায় মামলা রুজু করেছে। পুলিশ এলাকার সিসি ক‍্যামেরা ফুটেজ সংগ্রহ করছে। কোন রাস্তা দিয়ে মধুমিতা গিয়েছে, কার সাথে কোথায় দেখা করেছে, তার পরে কোথায় কীভাবে গিয়েছে তা জানার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলির সাহায্য নেওয়া হতে পারেও জানা গিয়েছে। 

যদিও এই বিষয়ে এখনও লালবাজারের কোনও বিবৃতি এখনও আসেনি। 


Share