Blood

রক্তের আড়ালে কোটি টাকার কারবার! রাজ্যের বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কে অনিয়মের বিস্ফোরক অভিযোগ, ভিন্‌রাজ্যে পাচার প্লাজমা-লোহিতকণিকা

স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। সামনে উৎসবের মরসুমের কথা মাথায় রেখেই সরকার আপাতত অবস্থান কিছুটা শিথিল করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে সরকারের দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৯ আগস্ট ২০২৬ ১২:৪৫

একাধিক অনিয়মের অভিযোগে রাজ্যের বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক স্বাস্থ্য দফতরের নজরে আসে। তদন্তের ভিত্তিতে একটি ব্লাড ব্যাঙ্কের লাইসেন্স বাতিল করা হয়। পাশাপাশি, পাড়ায় পাড়ায় রক্তদান শিবির আয়োজনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল আরও ১১টি ব্লাড ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রে। তবে শেষপর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে ওই সব পদক্ষেপই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। ‘অনিয়ম’ সংশোধনের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিকে সাত দিনের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সঙ্গে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। সামনে উৎসবের মরসুমের কথা মাথায় রেখেই সরকার আপাতত অবস্থান কিছুটা শিথিল করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তকে সরকারের দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভবিষ্যতে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রাথমিক ভাবে ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির দুর্নীতি নিয়ে প্রশাসন যে অভিযোগ তুলেছিল, তার পরিধি রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই দাবি করেছিলেন, এই কেলেঙ্কারির অঙ্ক একশো কোটি টাকা ছুঁতে পারে।

গত ২৩ জুন ঘটনার সূত্রপাত হয়। দক্ষিণ কলকাতার একটি ব্লাড ব্যাঙ্কে রক্তের মজুতের হিসাব মিলাতে গিয়ে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম ছ’মাসেই ভিন্‌রাজ্যের বিভিন্ন ব্লাড ব্যাঙ্কে প্রায় ছ'কোটি টাকার লোহিতকণিকা ও প্লাজমা বিক্রি করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে রক্ত পাঠাতে হলে ন্যাশনাল ব্লাড ট্রান্সফিউশন কাউন্সিলের অনুমতি বাধ্যতামূলক। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাঙ্ক সেই অনুমতিই নেয়নি। ফলে প্রশ্ন উঠছে, অনুমতি ছাড়াই কী ভাবে এত বিপুল পরিমাণ রক্তের উপাদান অন্য রাজ্যে পাঠানো হল এবং এই কারবারের সঙ্গে আরও কতগুলি প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি যুক্ত?

স্বাস্থ্য দফতর অন্য বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির কার্যকলাপও খতিয়ে দেখতে শুরু করে। তদন্তে দক্ষিণ কলকাতার আরও কয়েকটি ব্লাড ব্যাঙ্কের হিসেবেও গরমিলের অভিযোগ সামনে আসে। স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, মোটা টাকার বিনিময়ে ওই ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিও উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে রক্ত বিক্রি করেছে।

রাজ্যে বর্তমানে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের সংখ্যা ৭৪টি। এর মধ্যে ১২টি ব্লাড ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে বেআইনি কাজকর্মের প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি স্বাস্থ্য দফতরের। বাকিদের ক্ষেত্রেও কিছু অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, যদিও সেগুলি তুলনামূলক ভাবে কম গুরুতর। একটি রাজ্যে বছরে কত পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন, তারও একটি নির্দিষ্ট হিসেব রয়েছে। সাধারণ ভাবে ধরা হয়, রাজ্যের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের সমান সংখ্যক ইউনিট রক্ত প্রতি বছর প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা যদি প্রায় ১০ কোটি ধরা হয়, তাহলে বছরে প্রয়োজন প্রায় ১০ লক্ষ ইউনিট রক্ত। এই চাহিদা মেটাতে ৭৪টি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের পাশাপাশি রয়েছে ৮৯টি সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক। রক্তের জোগান আসে মূলত সারা বছর ধরে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে আয়োজিত রক্তদান শিবির থেকে। সরকারি বা বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের সহযোগিতায় আয়োজিত এই শিবিরগুলিতে সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় রক্ত দেন। সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি সেই রক্ত সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। ফলে পুরো ব্যবস্থাটিই অনেকাংশে নির্ভর করে মানুষের স্বেচ্ছাসেবী মানসিকতা ও সদিচ্ছার উপর। স্বাস্থ্যকর্তাদের মতে, রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রে সচেতনতার ভিত্তিতে আয়োজিত এই ধরনের শিবিরই আদর্শ ব্যবস্থা। কারণ, স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে সংগৃহীত রক্তে এইচআইভি-সহ বিভিন্ন সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক ভাবে কম থাকে। এই ধরনের রক্তদান শিবিরে কোনও রকম আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ বেআইনি। অথচ অভিযোগ, সেই আইনই বিভিন্ন জায়গায় লঙ্ঘিত হচ্ছে।

এই ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির কাজকর্ম খতিয়ে দেখার সূত্রপাত হয়েছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে আসা একটি অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগ ছিল, একটি রক্তদান শিবিরে রক্তদাতাদের পাখা উপহার দেওয়া হয়েছে। সেই সংক্রান্ত ছবিও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। স্বাস্থ্যকর্তাদের দাবি, সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিবর্তে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিকে দিয়ে রক্তদান শিবির পরিচালনা করানোর প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। এর নেপথ্যে উপহার বা অন্যান্য আর্থিক লেনদেনের যোগ থাকতে পারে বলেও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে ওই শিবির থেকে রক্ত সংগ্রহ করা বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কটির দফতরে অডিট করা হয়। সেই অডিটেই একের পর এক অনিয়মের ছবি প্রকাশ্যে আসে।

স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদের দাবি, রক্তদানের ক্ষেত্রে এ রাজ্যের মানুষের সচেতনতা পড়শি রাজ্যগুলির তুলনায় যথেষ্ট বেশি। রক্তদানের গুরুত্ব নিয়ে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নিয়মিত প্রচার চালায়। সারা বছরই রাজ্যের নানা প্রান্তে রক্তদান শিবির আয়োজিত হয়। ফলে সংগৃহীত রক্তের পরিমাণ অনেক সময় রাজ্যের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়।

অভিযোগ, সেই অতিরিক্ত রক্তই অসাধু উপায়ে কয়েকটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক ভিন্‌রাজ্যে বিক্রি করে। এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে রক্ত বিভিন্ন আকারে পাঠানো যায়। এর মধ্যে রয়েছে সমস্ত উপাদান-সহ সম্পূর্ণ রক্ত বা ‘হোল ব্লাড’। আবার রক্তের উপাদান পৃথক করার পর লোহিতকণিকা বা ‘প্যাক্ড রেড ব্লাড সেল’, প্লেটলেট এবং প্লাজমাও আলাদা ভাবে পাঠানো হয়। এই উপাদানগুলির মধ্যে লোহিতকণিকার চাহিদাই সবচেয়ে বেশি। থ্যালাসেমিয়া-সহ নানা রোগের চিকিৎসায় লোহিতকণিকার প্রয়োজন হয়। অন্য দিকে, ওষুধ প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলির কাছেও প্লাজমার চাহিদা রয়েছে। তবে রক্ত বা তার কোনও উপাদান কারা, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন রাজ্যে পাঠাতে পারবেন, পাশাপাশি কারা তা গ্রহণ করতে পারবেন এ বিষয়ে নির্দিষ্ট সরকারি নির্দেশিকা রয়েছে। রক্ত ও রক্তের উপাদানের মূল্যও সরকার নির্ধারণ করে দেয়।

কেন্দ্রে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগে এ দেশের প্লাজমার বড় অংশই বিদেশে পাঠানো হত। বর্তমানে দেশীয় পাঁচটি সংস্থা প্লাজমা নিয়ে কাজ করছে। তারা প্লাজ়মার গুণগত মান যাচাই করে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির কাছ থেকে তা সংগ্রহ করে। তেলঙ্গানার একটি সংস্থা উদ্বৃত্ত প্লাজ়মা কেনার জন্য টেন্ডারের মাধ্যমে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের সঙ্গে চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি লিটার প্লাজমার দাম চার হাজার ১১৬ টাকা। অন্য দিকে, একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক সূত্রের দাবি, তারা প্রতি লিটার চার হাজার ৪০০ টাকা দরে ভিন্‌রাজ্যে প্লাজমা পাঠায়।

স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেলের এক প্রাক্তন কর্তার হিসাবে, রাজ্যের সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি বছরে প্রায় ১১ থেকে ১২ লক্ষ ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করে। বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির সংগ্রহ প্রায় সাত থেকে আট লক্ষ ইউনিট। অর্থাৎ, সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে রাজ্যে সংগৃহীত রক্তের পরিমাণ চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ। এই উদ্বৃত্তের একটি অংশের প্লাজ়মা ভিন্‌রাজ্যে পাঠানো হয়। স্বাস্থ্য দফতর সূত্রের দাবি, উদ্বৃত্ত প্লাজমা অন্য রাজ্যে পাঠানোর আগে ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিকে সরকারের আগাম অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু তদন্তে উঠে এসেছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়েই প্লাজমা ভিন্‌রাজ্যে পাঠানো হয়েছে।

অডিটের সময় উদ্ধার হওয়া নথিপত্র খতিয়ে দেখে স্বাস্থ্য দফতরের কর্তাদের দাবি, একাধিক বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক কোটি কোটি টাকার প্লাজমা ভিন্‌রাজ্যে পাঠিয়েছে। নথি অনুযায়ী, মধ্য কলকাতার একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে প্রায় ২৮ হাজার ইউনিট রক্ত সংগ্রহ করে। এর মধ্যে প্রায় ন'হাজার ইউনিট প্লাজমা এ রাজ্যের রোগীদের দেওয়া হলেও ১৬-১৭ হাজার ইউনিট প্লাজমা অন্যত্র পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ। কলকাতার আরও একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্ক থেকে মাত্র ছ’মাসে তিন কোটি টাকার বেশি মূল্যের প্লাজ়মা অন্যত্র পাঠানো হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্তাদের অভিযোগ, এ ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মও মানা হয়নি।

প্লাজমা বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ থাকলে রক্তদান শিবিরের দিকে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলির নজর পড়া স্বাভাবিক বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। কারণ, রক্ত সংগ্রহের অন্যতম প্রধান উৎস এই শিবিরগুলি। সরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের এক কর্তার কথায়, সরকারি হাসপাতালের মাধ্যমে আয়োজিত রক্তদান শিবিরে প্রতি রক্তদাতার ‘রিফ্রেশমেন্ট’ বাবদ ১০০ টাকা খরচ করা হয়। পাশাপাশি, শিবির আয়োজনের জন্য ৫০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত আয়োজকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে দেওয়া হয়।

অন্য দিকে, একটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের কর্তার দাবি, তাঁদের আয়োজিত শিবিরে রক্তদাতাদের ‘রিফ্রেশমেন্ট’ বাবদ ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা খরচ করা হয়। তাঁর হিসেব অনুযায়ী, যাতায়াত, রক্ত সংরক্ষণ-সহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে ৫০ জনের একটি রক্তদান শিবিরে প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়।

তবে এর আড়ালে আরও একাধিক খরচের অভিযোগ রয়েছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই জানিয়েছেন, রক্তদাতাদের আকৃষ্ট করতে কোথাও প্রেশার কুকার, কোথাও ফ্যান, আবার কোথাও স্মার্ট ওয়াচ উপহার দেওয়ার ঘটনা সামনে এসেছে। নজরদারি এড়াতে কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতাদের কুপনও দেওয়া হয়েছে। সেই কুপন দেখিয়েই পরে উপহার সংগ্রহ করার সুযোগ মিলত।

রাজ্যে সারা বছর যত রক্তদান শিবির আয়োজিত হয়, তার প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই করে বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি। অভিযোগ, যে শিবিরে উপহারের হাতছানি যত বেশি, সেখানে রক্ত সংগ্রহের পরিমাণও তত বেশি। রক্ত সংগ্রহের লক্ষ্যে রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকাতেও বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলি পৌঁছে যায়। আর উপহারের পরিমাণ যত বাড়ে, সংশ্লিষ্ট ব্লাড ব্যাঙ্কের আরও বেশি রক্তদান শিবির করার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়ে।

নিয়ম ভেঙে উপহার দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি, রক্ত সংগ্রহের ক্ষেত্রেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুর্গাপুরের একটি রক্তদান শিবিরে ১১ ও ১৩ বছর বয়সি শিশুদের কাছ থেকে রক্ত নেওয়ার অভিযোগে তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সিদের কাছ থেকে রক্ত নেওয়া যায় না। রক্তদাতার হিমোগ্লোবিনের মাত্রা প্রতি ডেসিলিটারে অন্তত ১২.৫ গ্রাম এবং ওজন ন্যূনতম ৪৫ কেজি হওয়া বাধ্যতামূলক। ৪৫ থেকে ৫৪ কেজি ওজনের ক্ষেত্রে ৩৫০ মিলিলিটার এবং ৫৫ কেজি বা তার বেশি ওজন হলে সর্বোচ্চ ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করা যায়। তদন্তে উঠে এসেছে, একাধিক ক্ষেত্রে এই নির্দেশিকা মানা হয়নি। ৩৫০ মিলিলিটারের জন্য নির্ধারিত পাউচে ৫০০ মিলিলিটার পর্যন্ত রক্ত নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট পরিমাণ রক্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই রক্ত জমাট বাঁধা রোধকারী রাসায়নিকের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। ফলে নির্ধারিত মাত্রার বেশি রক্ত সংগ্রহ করলে তার গুণমান ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

এ ছাড়াও, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রক্ত সংরক্ষণের অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে। প্রতিটি রক্তদান শিবিরে এমবিবিএস চিকিৎসক রাখা বাধ্যতামূলক হলেও কয়েকটি ক্ষেত্রে ডাক্তারি পড়ুয়াদের দিয়ে সেই দায়িত্ব সামলানো হয়েছে। চিহ্নিত পড়ুয়াদের কাছ থেকে ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার মুচলেকাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, কয়েকটি বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কের পরিকাঠামো নিয়েও গাফিলতির অভিযোগ মিলেছে। ফলে রক্ত সংগ্রহ থেকে সংরক্ষণ পুরো প্রক্রিয়াতেই একাধিক স্তরে নিয়মভঙ্গের বিষয়টি তদন্তকারীদের নজরে এসেছে।

রাজ্যের স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশের দাবি, রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহকে ঘিরে ব্যবসা এবং অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়, বেশ কয়েক বছর ধরেই তা চলে আসছে। স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেলের এক প্রাক্তন কর্তা এ জন্য ড্রাগ কন্ট্রোল বিভাগের ‘ঢিলেঢালা’ মনোভাবকেই দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, নিয়ম অনুযায়ী ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিতে ড্রাগ কন্ট্রোল ও স্টেট ব্লাড ট্রান্সফিউশন সেলের যৌথ পরিদর্শনের কথা থাকলেও বাস্তবে তা নিয়মিত হত না। বরং পুরো বিষয়টিই কার্যত ড্রাগ কন্ট্রোলের নিয়ন্ত্রণে ছিল। তাঁর প্রশ্ন, নিয়মিত পরিদর্শন হয়ে থাকলে এত দিন ধরে চলা এই অনিয়ম আগে কেন নজরে এল না?

এই মুহূর্তে অনিয়মে জড়িত বেসরকারি ব্লাড ব্যাঙ্কগুলিকে স্বাস্থ্য দফতর সতর্ক করেই ছেড়ে দিয়েছে। তবে রক্তকে ঘিরে ব্যবসা ও অনিয়মের অভিযোগ প্রকাশ্যে আসায় রক্তদানে মানুষের আগ্রহ কমতে পারে বলে আশঙ্কা সমাজকর্মীদের। 


Share