Mamata Banerjee

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ‍্যাকাউন্টে সরাসরি ৩০ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করেন ইন্দ্রনীল সেন, দুর্গাপুজোর টিকিট বিক্রি দুর্নীতিতে জড়িয়ে গেল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নাম

গত জুন মাসে বউবাজার থানায় এক ব‍্যক্তি অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রীর সংস্থা ‘মাস আর্ট’ ইউনেস্কো-র নাম ভাঁড়িয়ে পুজো পরিক্রমার আয়োজন করে। ২০২১ সালে দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর Intangible Cultural Heritage of Humanity’ তালিকায় স্থান পায়। সেই মামলার সূত্র ধরেই ইডি তদন্ত শুরু করেছে।

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০১ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:১৭

প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ‍্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা ট্রান্সফার করেছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেন। দুর্গাপুজোর টিকিট বিক্রি দুর্নীতির তদন্তে নেমে এমনই তথ‍্য জেনেছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট। উল্লেখ্য, তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন মমতা নিজেই। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন উঠেছে মমতাকে এই মামলায় ইডি জেরা করবে কি না তা নিয়ে।

ইডির দাবি, ইন্দ্রনীল সেন মন্ত্রী থাকাকালীন ‘মেসার্স অক্টেভ রেকর্ডস’-এর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩.৮ কোটি টাকারও বেশি নগদ জমা পড়েছিল। ইন্দ্রনীল ওই সংস্থার মালিক ছিলেন বলে দাবি করা হয়েছে। ওই সেই টাকা ওই সংস্থার অ্যাকাউন্ট থেকে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো হয়। এই বিষয়ে ইন্দ্রনীল সেনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি ইডিকে জানিয়েছেন, রয়‍্যালটি বাবদ মুখ‍্যমন্ত্রীকে দেওয়া হয়েছিল।

ইনেস্কোর নাম ভাঁড়িয়ে দুর্গাপুজো পরিক্রমার টিকিট বিক্রিতে আর্থিক দুর্নীতির তদন্তে কলকাতার ১৫টি জায়গায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর তল্লাশি চলে। প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের বাড়িতেও তল্লাশি চালায়। ইডির দাবি, গত ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মাসআর্ট সোসাইটির মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। নিজেদের ইউনেস্কোর অনুমোদিত সংস্থা হিসেবে পরিচয় দেয়। এই অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। কলকাতার ২৪টি নির্বাচিত দুর্গাপুজো মণ্ডপে ‘প্রিভিউ শো’-এর জন্য এক হাজার ৭৪৯ টাকা থেকে পাঁচ হাজার ৪৯৯ টাকায় টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল।

জাল টিকিট সাধারণ মানুষকে গছিয়ে দিয়ে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে, তার একটি বড় অংশ নগদে তুলে নেওয়া হয়েছিল। কিছু অর্থ ‘বিবিধ খরচ’ হিসেবে দেখিয়ে হিসাব থেকে আয়ব‍্যায়ের খরচ থেকেই বাদ দেওয়া হয়েছিল। গত ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এক লক্ষেরও বেশি জাল টিকিট বিক্রি হয়েছিল। তার জন‍্য ইউনেস্কোর নাম, লোগো এবং সুনাম বিশ্বসংস্থার অনুমতি ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে ইডি।

ইডির তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ইন্দ্রনীল সেন মন্ত্রী থাকাকালীন পর্যটন এবং তথ‍্য এ সংস্কৃতি দফতরের ৮৫ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের একাধিক টেন্ডারের বরাত ধ্রুবজ্যোতি বসু ও দীপেশ রায়ের মালিকানাধীন সংস্থাগুলি পেয়েছিল। ওই দুই ব্যক্তি ইন্দ্রনীল সেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলে ইডি দাবি করেছে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি আবার পরবর্তী কালে ইন্দ্রনীল সেনের আত্মীয়দের নিয়ন্ত্রণাধীন সংস্থাগুলিতে বিপুল পরিমাণ টাকা স্থানান্তরিত করা হয়েছে। সমান্তরাল ভাবে, ওই সংস্থাগুলির ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে বড় অঙ্কের নগদ টাকা তোলা হয়েছে। সেই নগদ টাকা কীভাবে কোথায় ব‍্যবহার করা হয়েছে বিষয়টি খতিয়ে দেখছে ইডি।

রাজ‍্যে পালাবদলের পরে মাসআর্টের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে বউবাজার থানায় প্রতারণার অভিযোগ দায়ের হয়েছিল। ওই এফআইআরের ভিত্তিতেই ইডি ইসিআইআর দায়ের করে তদন্ত শুরু করেছে। সেই অভিযোগে ইন্দ্রনীল সেন ছাড়াও মাসআর্টের সভাপতি তথা ইন্দ্রনীলের স্ত্রী মধুছন্দা সেন, সম্পাদক ধ্রুবজ্যোতি বসু, সহ-সভাপতি সায়ন্তন মৈত্র, কোষাধ্যক্ষ রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়-সহ একাধিক ব্যক্তির নাম রয়েছে। তাঁরাও ইডির স্ক‍্যানারে রয়েছেন। ইডি সূত্রের খবর, ইন্দ্রনীলকে ৭ অক্টোবর আবার সিজিও কমপ্লেক্সে ডেকে পাঠানো হয়েছে। বুধবার টালা প্রত‍্যয়ের এক ‘মাতুব্বর’-কে ডেকে পাঠানো হলেও ওই যুবক সিজিও কমপ্লেক্সে যাননি।

২০২১ সালে দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর Intangible Cultural Heritage of Humanity’ তালিকায় স্থান পায়। ঘটা করে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচার করেছিলেন। ২০২২ সাল থেকেই ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমে পড়েন ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর স্ত্রী-র সিন্ডিকেট।

যে সময় কলকাতায় এ সব কার্যকলাপ চলছে সেই সময় তথ‍্য ও সংস্কৃতি দফতরের পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। জেরার মুখে পড়ে ইন্দ্রনীল দাবি করেছেন, ওই সংস্থা ৩০ লক্ষ টাকা রয়‍্যালিটি বাবদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তথা তথ‍্য ও সংস্কৃতি দফতরের মন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ‍্যাকাউন্টে দিয়েছেন। তা হলে কী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কি ইডি জিজ্ঞাসাবাদ করবে? তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। দফতরের প্রতিমন্ত্রীর মদতে যে টিকিট জালিয়াতি হচ্ছে তা কি মমতা জানতেন না? তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ।


Share