TMC Political Chaos

তৃণমূলের ‘বাঁ কান’-এর বড় ধাক্কা! দলের ৪৫০ কোটিরও বেশি টাকার অ্যাকাউন্ট ফ্রিজের আর্জি অরূপের

ফিরহাদ হাকিম আগেই মেয়র পদ ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশনেও তাঁকে সেই শিবিরের সদস্যদের সঙ্গেই বসতে দেখা যায়।

অরূপ বিশ্বাস।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ১১:৩৫

তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে একসময় ফিরহাদ হাকিম ও অরূপ বিশ্বাসকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডান কান’ ও ‘বাঁ কান’ বলে অভিহিত করা হতো। তবে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলের পর সেই ঘনিষ্ঠতার ছবিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ফিরহাদ হাকিম আগেই মেয়র পদ ছেড়ে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবিরে যোগ দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার বিধানসভার অধিবেশনেও তাঁকে সেই শিবিরের সদস্যদের সঙ্গেই বসতে দেখা যায়।

এ দিনই সামনে আসে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য। তৃণমূলের প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের শাখা ম্যানেজারের কাছে চিঠি দিয়ে দলের অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ’ করার আর্জি জানিয়েছেন। চিঠিতে তিনি নিজেকে তৃণমূল কংগ্রেসের কোষাধ্যক্ষ হিসেবেই উল্লেখ করেছেন।

এই প্রসঙ্গে মমতাপন্থী বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, ‘‘অরূপ তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। ৫ জুন দলের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সাংগঠনিক রদবদল ঘটিয়ে শুভাশিস চক্রবর্তীকে কোষাধ্যক্ষ করা হয়েছে।’’ কিন্তু সেই খবর ব্যাঙ্ককে জানিয়ে খাতায়কলমে পরিবর্তন করা হয়েছে কি? এই প্রশ্নের জবাবে কুণালের বক্তব্য, ‘‘এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই।’’ তৃণমূল সূত্রে অবশ্য খবর, ব্যাঙ্কের খাতায় এখনও অরূপই তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ।

তৃণমূলের ওই অ্যাকাউন্টে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, একসময় সেখানে ৬৭৫ কোটি টাকা ছিল। বর্তমানে সেই পরিমাণ কিছুটা কমলেও তা সাড়ে চারশো কোটির নিচে নয় বলে দলীয় সূত্রের দাবি। নির্বাচনী বন্ড থেকে বিপুল অর্থ পাওয়া দলগুলির মধ্যে বিজেপির পরেই ছিল তৃণমূল।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত অরূপ বিশ্বাস কেন দলের আর্থিক লেনদেন বন্ধ রাখার আবেদন জানালেন। তবে এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি তিনি। মেসি-কাণ্ড সংক্রান্ত তদন্তে বিধাননগর দক্ষিণ থানায় হাজিরা দেওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “এখনই কিছু বলব না, পরে বলব।”

রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার পর তৃণমূলের সংগঠন, দলীয় প্রতীক এবং তহবিলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামীরা নিজেদেরই প্রকৃত তৃণমূল বলে দাবি করছেন এবং সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। অন্য দিকে, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়ায় যোগ দিলেও তৃণমূলের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছাড়েনি।

দলীয় সূত্রের দাবি, সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় তৃণমূল নেতৃত্ব তহবিল সুরক্ষিত রাখার উপায় খুঁজছিল। এমনকি অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছিল বলে জানা যায়। এই খবর বিদ্রোহী শিবিরের কাছেও পৌঁছে যায়। এরপর অরূপ বিশ্বাসের উপর চাপ তৈরি হয় বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।

অরূপের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, কোষাধ্যক্ষ পদে পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনও ব্যাঙ্কের নথিতে প্রতিফলিত হয়নি। ফলে তাঁর আগাম সই করা কোনও চেক ব্যবহার করে টাকা তোলা হলে আইনি দায় তাঁর উপরই বর্তাতে পারে। সেই কারণেই তিনি ব্যাঙ্ককে সতর্কতামূলক চিঠি পাঠিয়েছেন।

চিঠিতে অরূপ উল্লেখ করেন, অতীতে দলের আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত অভিযোগে তাঁকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সাধারণত জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য তিনি আগাম সই করা কিছু চেক পার্টি অফিসে রেখে দিতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই চেকের অপব্যবহারের আশঙ্কা রয়েছে বলেই তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

অরূপের এই পদক্ষেপ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নানা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘনিষ্ঠ বিধায়ক সন্দীপন সাহার বক্তব্য, তহবিলের অপব্যবহারের আশঙ্কা থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। অন্যদিকে, মমতাপন্থী শিবিরের একাংশের মতে, আইনি জটিলতা এড়াতেই অরূপ এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকীর কটাক্ষ, ‘‘অরূপ বিশ্বাসের এই চিঠি আসলে বিজেপি-কে মিস্‌ কল দেওয়া। তিনি এখন মমতা-অভিষেককে টাইট দিয়ে ভাল তৃণমূল সাজতে চাইছেন।’’


Share