Draught Situation

বৃষ্টির ঘাটতিতে মহারাষ্ট্রের ৭৪% তহসিল খরার কবলে, ২৬৫ এলাকায় সরকারি ঘোষণা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মিলবে আর্থিক সাহায্য

অমরাবতী, সোলাপুর, লাতুর-সহ অন্তত ছয় জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। এর জেরে চাষাবাদ ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, মহারাষ্ট্র
  • শেষ আপডেট: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৩:২৬

দেশের একাংশে যখন টানা বৃষ্টিতে বন্যা ও জলমগ্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন উল্টো ছবি মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ এলাকায়। গোটা বর্ষার মরসুমেই বৃষ্টির ঘাটতিতে ভুগেছে রাজ্যের একাধিক জেলা। অমরাবতী, সোলাপুর, লাতুর-সহ অন্তত ছয় জেলায় স্বাভাবিকের তুলনায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। এর জেরে চাষাবাদ ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সমস্যায় পড়েছেন বহু কৃষক। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে শনিবার মহারাষ্ট্রের ৩৫৮টি তহসিলের মধ্যে ২৬৫টিকে খরাকবলিত ঘোষণা করল রাজ্য সরকার। অর্থাৎ, রাজ্যের প্রায় ৭৪ শতাংশ তহসিলই এখন খরার কবলে। বৃষ্টির ঘাটতির কারণে বহু এলাকায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। কৃষকদের আর্থিক পরিস্থিতিও সঙ্কটের মুখে পড়েছে। আবহাওয়াবিদদের একাংশের মতে, এই পরিস্থিতির নেপথ্যে এল নিনোর প্রভাবও থাকতে পারে।

খরাপ্রবণ এলাকাগুলির পরিস্থিতি সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে দু’দিন আগেই মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছিলেন। সেই সময়ই তিনি জানিয়েছিলেন, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দ্রুত খরা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করবে তাঁর সরকার। সেই মতো শনিবার ২৬৫টি তহসিলকে খরাকবলিত ঘোষণা করা হল। সরকারের এই ঘোষণার ফলে খরাগ্রস্ত এলাকার কৃষকেরা একাধিক সরকারি সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে কৃষকদের জন্য সরাসরি আর্থিক সাহায্যের পরিমাণ এখনই ঘোষণা করা হয়নি। ফসল ও অন্যান্য ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব পাওয়ার পরই আর্থিক সহায়তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে রাজ্য সরকার।

মহারাষ্ট্রে বৃষ্টির ঘাটতির জেরে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। রাজ্য সরকারের প্রকাশিত প্রস্তাবে কৃষি দফতরের কমিশনারের রিপোর্টের উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, গত জুন থেকে বৃষ্টির ঘাটতির কারণে রাজ্যের ২৬৫টি তালুকে খরা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, বর্ষার মরসুমে কোনও এলাকায় টানা ২১ দিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টি না হলে সেই এলাকাকে খরাপ্রবণ হিসেবে ধরা হয়। মহারাষ্ট্রের চিহ্নিত তালুকগুলি সেই মাপকাঠি পূরণ করেছে। বিশেষ করে বিড় এবং ধারাশিব জেলায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জুলাই মাসের পর থেকে এই দুই এলাকায় কার্যত বৃষ্টি হয়নি। ফলে দৈনন্দিন প্রয়োজনের জল জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাজ্য সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছত্রপতি সম্ভাজিনগর অঞ্চলে ৪২৪.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ওই সময়ে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৬১৩.১ মিলিমিটার হওয়ার কথা। অর্থাৎ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ৩০.৮ শতাংশ। পুণে এবং নাসিক অঞ্চলেও চলতি বর্ষায় বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৩০ শতাংশ। অমরাবতী এবং নাগপুর অঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি ২৭ শতাংশের কাছাকাছি। তুলনায় কোঙ্কণ অঞ্চলের পরিস্থিতি কিছুটা ভাল। সেখানে বৃষ্টির ঘাটতি ৬.৩ শতাংশ। পুরো মহারাষ্ট্রে জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষার মরসুমে গড় বৃষ্টির ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৮.৮ শতাংশ। এই সময়ে রাজ্যে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৯৩২.৩ মিলিমিটার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বৃষ্টি হয়েছে ৭৫৫.৯ মিলিমিটার। ফলে বৃষ্টির ঘাটতি ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিস্তীর্ণ অংশে জলসংকট এবং খরার আশঙ্কা বাড়িয়েছে।

বৃষ্টির ঘাটতিতে মহারাষ্ট্রে কৃষকেরা সমস্যায় পড়েছেন। খরিফ মরসুমে সয়াবিন, তুলো, মুগ, ভুট্টার মতো ফসল চাষ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় সেই চাষাবাদ ক্ষতির মুখে পড়েছে। সরকারি ক্ষতিপূরণের দাবিতে গত ১৬ সেপ্টেম্বর মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জেলায় পথে নেমেছিলেন কৃষকেরা।

মহারাষ্ট্রে যখন বৃষ্টির অভাবে কৃষিকাজ ধাক্কা খাচ্ছে, তখন দেশের পূর্বাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলছে ভারী বৃষ্টি। আবহাওয়াবিদদের মতে, বঙ্গোপসাগরে একের পর এক নিম্নচাপ তৈরি হওয়ার কারণেই পূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশে বৃষ্টির দাপট দেখা যাচ্ছে। অন্য দিকে, দেশের আরও বিস্তীর্ণ এলাকায় বৃষ্টির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রভাব ফেলছে এল নিনো।

প্রশান্ত মহাসাগরে কয়েক বছর অন্তর একটি বিশেষ জলবায়ুগত পরিবর্তন দেখা যায়। সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী বায়ুপ্রবাহ প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণ জলকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু সেই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ জল ফের পূর্ব দিকে সরে আসে এবং দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের কাছাকাছি জমা হতে থাকে। এর প্রভাবে মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকা অস্বাভাবিক ভাবে উষ্ণ হয়ে ওঠে। এই জলবায়ুগত পরিস্থিতিকেই বলা হয় ‘এল নিনো’। ‘এল নিনো’ একটি স্প্যানিশ শব্দ, যার অর্থ ‘ছোট্ট ছেলে’। বহু শতাব্দী আগে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলের মৎস্যজীবীরা প্রশান্ত মহাসাগরের জলে এই অস্বাভাবিক উষ্ণ স্রোতের উপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলেন। তাঁদের দেওয়া সেই নামই পরবর্তীকালে আবহাওয়া ও জলবায়ুবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ হয়ে ওঠে। এল নিনোর প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। ফলে কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও বৃষ্টির ঘাটতি দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। ভারতের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব বর্ষার স্বাভাবিক ছন্দে পড়তে পারে বলে মনে করেন আবহবিদেরা।

মহারাষ্ট্রে এই ঘোষণার পর রাজ্য সরকারের নির্দেশ মেনে চাষাবাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খতিয়ে দেখবেন জেলাশাসকেরা। বৃষ্টির ঘাটতির কারণে কতটা ফসল নষ্ট হয়েছে, তা সরেজমিনে পরিদর্শন করে নির্ধারণ করতে হবে। আধিকারিকদের মাঠে গিয়ে ফসলের বর্তমান পরিস্থিতির ছবি তুলতে হবে। প্রতিটি ছবির সঙ্গে জিপিএস লোকেশনও নথিভুক্ত করতে হবে। এরপর সেই রিপোর্ট কৃষি দফতরের কমিশনারের কাছে জমা দিতে হবে। জেলাশাসকদের দেওয়া রিপোর্টের ভিত্তিতেই কৃষকদের জন্য রাজ্য সরকার আর্থিক সাহায্য ঘোষণা করবে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনুযায়ী কত টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তও নেওয়া হবে ওই রিপোর্টের ভিত্তিতেই।


Share