Mahalaya

শিউলির গন্ধে, বীরেন্দ্রকৃষ্ণের কণ্ঠে মহালয়ার আগমনী, অশুভের বিনাশে শুভশক্তির জাগরণেই হোক দেবীপক্ষের সূচনা

দেবীপক্ষের সূচনায় তাই শুধু উৎসবের আগমনী নয়, নতুন করে ভালো থাকার, ভালো রাখার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথও নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতীকী চিত্র।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৮

ভোরের আকাশে আলো ফোটার আগেই বেজে ওঠে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের সেই চিরপরিচিত কণ্ঠস্বর—‘আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোকমঞ্জীর’। রেডিয়োর তরঙ্গে ভেসে আসে মহিষাসুরমর্দিনীর স্তোত্র, শিউলির গন্ধে ম ম করে ওঠে চারপাশ, আর বাঙালির মনে শুরু হয় শারদোৎসবের দিনগোনা। মহালয়া শুধু একটি তিথি নয়, বাঙালির আবেগ, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক অনন্য অধ্যায়। পিতৃপক্ষের অবসান ঘটিয়ে দেবীপক্ষের সূচনার এই দিনেই যেন অশুভ শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জাগরণের বার্তা পৌঁছে যায় প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে।

মহালয়ার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তর্পণের ঐতিহ্য। পূর্বপুরুষদের স্মরণ করে তাঁদের উদ্দেশে জল নিবেদন করার মধ্য দিয়ে মানুষ ফিরে তাকায় নিজের শিকড়ের দিকে। এই রীতির মধ্যে রয়েছে কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা এবং অতীতের সঙ্গে বর্তমানের আত্মিক যোগসূত্র। যে সমাজ নিজের অতীতকে সম্মান করতে জানে, সেই সমাজই ভবিষ্যতের পথকে আরও দৃঢ়ভাবে নির্মাণ করতে পারে। তাই মহালয়া কেবল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের দিন নয়, এটি আত্মসমীক্ষারও দিন।

অন্য দিকে, মহালয়ার অর্থ অশুভের বিরুদ্ধে শুভের জয়। পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুরের বিরুদ্ধে দেবী দুর্গার যুদ্ধ শক্তি ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার প্রতীক। বর্তমান সমাজেও এই প্রতীকের তাৎপর্য অপরিসীম। অন্যায়, দুর্নীতি, হিংসা, নারী নির্যাতন, বৈষম্য এবং অসহিষ্ণুতার মতো অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিদিনই লড়াই করতে হয় মানুষকে। দেবীর আরাধনা তখনই প্রকৃত অর্থ পায়, যখন সমাজের প্রতিটি নারী সম্মান ও নিরাপত্তা পান, দুর্বল মানুষ ন্যায়বিচারের অধিকার পান এবং মানবিকতা সমস্ত সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করে এগিয়ে যায়। মণ্ডপে দেবীর প্রতিমা প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি মানুষের বিবেকেও জাগ্রত হোক শুভবোধ—মহালয়ার প্রকৃত আহ্বান এটাই।

আজকের দ্রুতগতির জীবনে উৎসবের আড়ম্বর ক্রমশ বাড়ছে। আলোর রোশনাই, থিমের বৈচিত্র্য, কেনাকাটা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছবি ভাগ করে নেওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে শহর থেকে গ্রাম। কিন্তু সেই আনন্দের মধ্যেও মনে রাখা প্রয়োজন, উৎসবের সার্থকতা শুধু বাহ্যিক জাঁকজমকে নয়। দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটানো, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার মধ্য দিয়েই উৎসবের মানবিক রূপ পূর্ণতা পায়। দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে যে মিলনমেলার সৃষ্টি হয়, তা যেন ধর্ম, জাতি ও শ্রেণির বিভেদ ভুলে মানুষকে আরও কাছাকাছি নিয়ে আসে।

মহালয়া আমাদের অপেক্ষা করতে শেখায়, নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়। জীবনের নানা হতাশা, অনিশ্চয়তা ও অন্ধকারের মধ্যেও আলোর প্রত্যাশা হারিয়ে ফেলতে নেই—এই দিন সেই বিশ্বাসই ফিরিয়ে দেয়। দেবীপক্ষের সূচনায় তাই শুধু উৎসবের আগমনী নয়, নতুন করে ভালো থাকার, ভালো রাখার এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শপথও নেওয়া প্রয়োজন।

শারদপ্রাতে মহালয়ার সুরে জেগে উঠুক বাঙালির মন। দেবীর আগমনে দূর হোক অশুভ, প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়, আর মানুষের হৃদয়ে জ্বলে উঠুক সহমর্মিতা ও মানবিকতার আলো। কারণ, প্রকৃত দেবীপক্ষের সূচনা তখনই, যখন অন্ধকারকে জয় করে আলোর পথে এগিয়ে যাওয়ার সাহস অর্জন করে মানুষ।


Share