Dengue

পুজোর মুখে ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গি, রাজ্যে আক্রান্ত ১০ হাজার পার, হটস্পটে কড়া নজর স্বাস্থ্য ভবনের

স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের গণ্ডি পেরিয়ে ১০,১৭৭-এ পৌঁছেছে। সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। তাঁদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা।

স্বাস্থ্য ভবন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ১১:৩৬

পুজোর মুখে ফের চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গি। গ্রাম থেকে শহর—রাজ্যের একাধিক এলাকায় বাড়ছে ডেঙ্গির হটস্পট। নজরদারিতে সামান্য ঢিলেমি হলেই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা স্বাস্থ্য দফতরের। স্বাস্থ্য ভবন সূত্রের খবর, ৭ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ১০ হাজারের গণ্ডি পেরিয়ে ১০,১৭৭-এ পৌঁছেছে। সংক্রমণে মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। তাঁদের মধ্যে ৬৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। এই পরিস্থিতিতে দুর্গাপুজো-সহ উৎসবের মরসুমে ডেঙ্গি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ সতর্কতা চেয়ে এই প্রথম পৃথক অ্যাডভাইজ়রি জারি করল রাজ্য স্বাস্থ্য দফতর।

বুধবার স্বাস্থ্য ভবনে রাজ্যের সব জেলার জেলাশাসক ও জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকদের নিয়ে ডেঙ্গি পরিস্থিতি পর্যালোচনা বৈঠক করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের সচিব এবং কলকাতা, হাওড়া, বিধাননগর, শিলিগুড়ি, দুর্গাপুর ও আসানসোলের কমিশনারেরা। পাশাপাশি দমদম, দক্ষিণ দমদম, পানিহাটি, ব্যারাকপুর ও কামারহাটি পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসারেরাও বৈঠকে ছিলেন। রাজ্যের কোথায় ডেঙ্গির সংক্রমণ বেশি, কোন কোন এলাকা হটস্পটে পরিণত হয়েছে এবং কোথায় নতুন করে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে—তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন জনস্বাস্থ্য বিভাগের আধিকারিকেরা। এরপরই উৎসবের মরসুমে নজরদারি আরও জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

স্বাস্থ্য দফতরের পরিসংখ্যান বলছে, মৃত এবং আক্রান্ত—দুই ক্ষেত্রেই আপাতত গ্রামবাংলার পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগের। ডেঙ্গিতে মৃত ১৪ জনের ৬৪ শতাংশই গ্রামীণ এলাকার বাসিন্দা। মৃতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, প্রায় ৪২ শতাংশের বয়স ৪৬ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। ৩৫ শতাংশের বয়স ৪৫ বছরের নীচে। মৃতদের ৭৮ শতাংশই সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।

সংক্রমণের ক্ষেত্রেও গ্রামীণ এলাকার ছবিই বেশি উদ্বেগজনক। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্ত ১০,১৭৭ জন। সংক্রমণের হার ১.২ শতাংশ। ২০২৫ সালের একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১২,৬৫২, সংক্রমণের হার ১.৪ শতাংশ। তবে এ বছর পরীক্ষার সংখ্যাও গতবারের তুলনায় কিছুটা কম। ২০২৫ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ৮ লক্ষ ৬৬ হাজার ৫৯৬টি ডেঙ্গি পরীক্ষা হয়েছিল। এ বছর সেই সংখ্যা ৮ লক্ষ ৪৭ হাজার ৫১১।

এ বছর ন’টি জেলায় ডেঙ্গি সংক্রমণের হার তুলনামূলক বেশি। তালিকায় রয়েছে মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, উত্তর ২৪ পরগনা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, নদিয়া, হুগলি, হাওড়া, মালদহ এবং পূর্ব বর্ধমান। স্বাস্থ্য দফতরের আধিকারিকদের আশঙ্কা, পুজোর সময় সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে। কারণ সেপ্টেম্বর জুড়ে রাজ্যে ডেঙ্গি আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩,৯৪৮। অথচ অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহেই আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ১,১০০ জন। ২০২৪ সালেও অগস্টে আক্রান্তের সংখ্যা ৪,৪২২ থেকে সেপ্টেম্বরে বেড়ে হয়েছিল ৬,৩২৩।

রাজ্যের ১৪টি গ্রাম পঞ্চায়েতে সম্প্রতি আচমকা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ায় বিশেষ নজরদারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় রয়েছে রঘুনাথগঞ্জ-২, তেহট্ট-১, মাল, নওদা, লালগোলা, পোলবা, ভাঙড়-১, ভাঙড়-২, সুতি-২, পূর্বস্থলি-১, জলঙ্গি, মাটিয়ালি, বেলডাঙা-১ এবং চাকদহ। পাশাপাশি সামশেরগঞ্জ, সাগরদিঘি, কালনা-১, রানাঘাট-২, জয়নগর-২, হরিপাল, নামখানা, সাঁইথিয়া এবং মুরারই-২ ব্লকেও ডেঙ্গির সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

শহরাঞ্চলেও তৈরি হয়েছে একাধিক হটস্পট। কলকাতা পুরসভার ৬, ১৬, ৭৭, ১০৯, ১১৬ এবং ১১৭ নম্বর ওয়ার্ডে নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন বলে মনে করছে স্বাস্থ্য ভবন। হাওড়ার ২৯, ১৩ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ড, বিধাননগরের ১২, ১৩, ৩৬ ও ৩৯ নম্বর ওয়ার্ড, আসানসোলের ৮২, ৮৪ ও ৮৫ এবং চাকদহের ১৩ নম্বর ওয়ার্ডকেও হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দমদম, দক্ষিণ দমদম, কামারহাটি, বরাহনগর ও দুর্গাপুর পুরসভার কয়েকটি ওয়ার্ডেও সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে পুজোর সময় হটস্পট এলাকাগুলিতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে জ্বরের খোঁজ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য ভবন। বড় পুজো মণ্ডপ ও মেলা প্রাঙ্গণে এডিস ইজিপ্টাই মশার লার্ভা খুঁজতে বিশেষ অভিযান চালাতে বলা হয়েছে। উৎসবের মধ্যেও বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোম ও ল্যাবরেটরি থেকে প্রতিদিন ডেঙ্গি আক্রান্তের তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বাড়িতে চিকিৎসাধীন রোগীদের শারীরিক অবস্থারও নিয়মিত খোঁজ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুজোর আগেই জেলা স্তরে ডেঙ্গি পরিস্থিতি নিয়ে পর্যালোচনা বৈঠক করার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য দফতর।


Share