France Riot

ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স, স্কুলে স্কুলে অবরোধ-অগ্নিসংযোগ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

একের পর এক স্কুল অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাসের ব্যবহার এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্যারিস-সহ একাধিক শহরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্সে ছাত্রবিক্ষোভ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, ফ্রান্স
  • শেষ আপডেট: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ ০৪:৩৫

সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, ভগ্ন পরিকাঠামো এবং শিক্ষক সংকটের প্রতিবাদে তীব্র ছাত্রবিক্ষোভে উত্তাল ফ্রান্স। দেশের একাধিক শহরে স্কুল ও কলেজের পড়ুয়ারা পথে নেমেছেন। গত কয়েক মাসের মধ্যে এটিই অন্যতম বড় ছাত্র আন্দোলন বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে। একের পর এক স্কুল অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, টিয়ার গ্যাসের ব্যবহার এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনায় প্যারিস-সহ একাধিক শহরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ইতিমধ্যেই বহু আন্দোলনকারীকে গ্রেফতার ও আটক করা হয়েছে। ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় সামনে এনেছেন। তবে আন্দোলনের নামে হিংসা, সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের তীব্র নিন্দা করেছে সরকার।

আন্দোলনকারী পড়ুয়া ও শিক্ষকদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে সরকারি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানো এবং পরিকাঠামোর প্রতি অবহেলার জেরে দেশের বহু স্কুলের অবস্থা বেহাল। কোথাও ক্লাসরুমে পড়ুয়ার সংখ্যা অত্যধিক, কোথাও আবার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর ঘাটতি। বহু স্কুলে ছাদ থেকে জল পড়া, দেওয়ালে ফাটল এবং অন্যান্য পরিকাঠামোগত সমস্যার মধ্যেই চলছে পঠনপাঠন।

শিক্ষকদের বেতন এবং কর্মপরিবেশ নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে আন্দোলনকারীদের। তাঁদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত বেতন ও কাজের পরিবেশ না থাকায় যোগ্য শিক্ষকরা চাকরি ছাড়ছেন। তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে পড়াশোনায়। পাশাপাশি, ফরাসি শিক্ষা ব্যবস্থায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। অভিযোগ, পড়ুয়ার পারিবারিক ও আর্থিক পরিস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই তার শিক্ষাজীবন ও ভবিষ্যতের সুযোগকে প্রভাবিত করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং তীব্র গরমের সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত পরিবেশের অভাবও আন্দোলনের অন্যতম ইস্যু।

শুক্রবার পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দেশের শত শত হাইস্কুলে পড়ুয়ারা অবরোধ শুরু করেন। কোথাও স্কুলের গেটে ব্যারিকেড তৈরি করা হয়, কোথাও আবার ডাস্টবিনে আগুন জ্বালিয়ে প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাজধানী প্যারিসের লিসি ভলতেয়ার-সহ একাধিক নামী স্কুলের সামনে বিশাল জমায়েত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিপুল পুলিশবাহিনী।

প্যারিসের পাশাপাশি লিঁও, স্ট্রাসবুর্গ এবং মন্টপেলিয়ারের মতো শহরেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বেশ কিছু জায়গায় শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি হলেও, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় তা সংঘর্ষের রূপ নেয়। প্যারিসের দুটি বড় স্কুলের প্রধান ফটকে আগুন লাগানোর ঘটনাও ঘটে। রাস্তায় ডাস্টবিন ও আতশবাজি ছুড়ে বিক্ষোভ দেখানো হয়। ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে এবং রাস্তা পরিষ্কার করতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে।

অন্য দিকে, পড়ুয়া ও অভিভাবক সংগঠনগুলির অভিযোগ, আন্দোলন দমনে পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলছে। যদিও সরকারের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের বিরোধিতা করা হচ্ছে না। তবে 'আরবান ভায়োলেন্স' বা নগর হিংসা কোনওভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। শিক্ষা মন্ত্রকের দাবি, বিক্ষোভ ও সংঘর্ষের ঘটনায় প্রায় ৬৫ জন শিক্ষা কর্মী আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৪০ জন স্কুলের প্রধান শিক্ষক বা প্রিন্সিপাল।

তবে আন্দোলনকারীদের দাবি শুধু স্কুলের ভবন মেরামত বা পরিকাঠামো উন্নয়নে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো, পর্যাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষকদের উন্নত কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষার সামগ্রিক মানোন্নয়নের জন্য স্পষ্ট পরিকল্পনা চেয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য কম খরচে আবাসন এবং ভর্তুকিযুক্ত খাবারের মতো সামাজিক সুরক্ষার দাবিও উঠেছে।

ফলে শিক্ষা সংস্কার ও পরিকাঠামোর প্রশ্নে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমেই বৃহত্তর আন্দোলনের চেহারা নিয়েছে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই তীব্র ছাত্রবিক্ষোভ এখন ফরাসি সরকারের সামনে বড়সড় প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


Share